সাইফ বরকতুল্লাহ : মৌচাক মার্কেটে হলো দেখা/নিউ মার্কেটে হলো পরিচয়/রমনা পার্কে বসে/গাছের ছায়ায় মনটা করেছি বিনিময়..। গানটা কার না মনে আছে। এক সময় আমি এই গান শুনে মৌচাক মার্কেট দেখার ইচ্ছে পোষণ করতাম। তখন গ্রামে থাকি। মনে মনে ভাবতাম, মার্কেটটা কেমন? হয়তো অনেক বড়, সুন্দর, লাইটিং কতকিছু আছে সেখানে। সেখানে প্রিয়জনকে নিয়ে ঘোরার মজাটাই আলাদা। নানা ভাবনা মনে জাগত।
সেদিন খবরে দেখলাম, সেই মৌচাক মার্কেট নাকি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কারণ, ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এর কিছুদিন আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র ভবনটিও ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ভবন ভাঙার নির্দেশও প্রথম দেন হাইকোর্ট। সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে আপিল বিভাগ তা বহাল রাখেন।
২০০৭-০৮ সালের কথা। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। এ সময় রাজধানীতে র্যাংগস ভবন ভেঙে ফেলা হয়। কারণ হিসেবে ছিল রাস্তার ওপর অবৈধভাবে নির্মাণ। কিন্তু বিজিএমইএ ভবনের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু ভিন্ন। এ ভবনটি দৃষ্টিনন্দন। এ ভবনের পাশেই হাতিরঝিল। সেখানে যত ভবন আছে তার মধ্যে একমাত্র বিজিএমইএ ভবনটি অন্যরকম।
মৌচাক মার্কেট, প্রতিদিন এখানে অনেক লোক আসেন। ক্রেতা-বিক্রেতা অনেকেই আসেন। যারা আসেন তাদের সবার নিরাপত্তার প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত। তাই বলব, ভবনের মালিক কিংবা দোকান মালিকরা বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের মতামত পছন্দ না করলে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ নিতে পারেন। এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম।
রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এরকম অনেক মার্কেট ও ভবন আছে। রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সহযোগী দুই সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশনের তথ্যে অনেক অমিল। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ।
কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে ঢাকায় ৭২ হাজার ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল বলেন, বিল্ডিংকোড বাস্তবায়নে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো এখনো না ভাঙায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মায়া। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন লাল রঙ করে দিলাম, এক মাস পরে সেই লাল রঙ সাদা হয়ে যায় কিন্তু বিল্ডিং ভাঙে না।
২০০৪ সালে পুরনো ঢাকার শাঁখারীবাজারে জরাজীর্ণ ভবন ধসে ১৯ জন মারা যায়। আর বেগুনবাড়ীতে ভবনধস ও নিমতলীতে আগুনে পুড়ে বেশ কিছু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আমরা দেখেছি। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। শাঁখারীবাজার দুর্ঘটনার পর ৬৮৭টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করার পরও আজো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এসব ভবনের বয়স দুশ থেকে আড়াইশ বছর। রাজধানীতে অনেক ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে এসব ভবনে বাস করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে সরকারের সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে সমন্বিত কারিগরি জরিপ করা দরকার। না হলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
রাজধানীর চাঁনখারপুলে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি এর ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হেরিটেজ বড় নাকি মানুষের জীবন বড়? চিকিৎসা বড় নাকি হেরিটেজ? ভবনের যতটুকু রাখলে হেরিটেজ রক্ষা হয় ততটুকু রেখে বাকি জায়গায় নতুন ভবন হবে। পুরোনো ভবন ভেঙে মানুষ মারা গেলে তখন কেউ হেরিটেজের দোষ দেবে না, দোষ দেবে সরকারের। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ভেঙে ফেলার খবরে হেরিটেজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে টেলিভিশনে টক শো ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু হবে।
আসলেও তাই। ভালো কাজ করতে গেলে সমালোচনা হবেই। এটা মেনেই সামনে এগুতে হবে। কে কী বলল- তাতে যায় আসে না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আমরা দেখতে চাই না। সেটা মৌচাক মার্কেট হোক আর অন্যকোনো ভবনই হোক। মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে কোনো ছাড় নয়। র্যাংগস ভবন যেমন ভাঙা হয়েছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা হোক। ভাঙা হোক। কারণ, আরেকটি রানা প্লাজা বিপর্যয় আমরা দেখতে চাই না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা, নতুন নির্মিত ভবনগুলো যাতে বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয় তা নিশ্চিত করা ও আনুষঙ্গিক সব কাজ সম্পাদন করায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো বছরের পর বছর ঝুঁকি নিয়েই চলবে- এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জুন ২০১৬/সাইফ/শাহনেওয়াজ