আবু হোসেন পরাগ : স্কোরকার্ড বলছে, ভারতের দেওয়া ৩৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯৫ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। যদিও প্রস্তুতি ম্যাচে জয়-পরাজয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়া। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা কতটা ঝালিয়ে নিতে পারলেন নিজেদের? স্পিনাররা নিজেদের মেলে ধরতে পারলেন না ঠিকভাবে। বড় লক্ষ্য তাড়া করার যে মানসিকতা, সেটা খুব একটা দেখা গেল না ব্যাটসম্যানদের মধ্যেও। বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের প্রাপ্তি শুধু পেসারদের ভালো বোলিং আর লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে লিটন মাত্র একটি ম্যাচই খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, করেছিলেন ৭৬ রান। কার্ডিফে মঙ্গলবার প্রস্তুতি ম্যাচে তামিম ইকবালের বিশ্রামে সুযোগ পেয়ে লিটন খেললেন ৭৩ রানের দারুণ ইনিংস। তাতে বিশ্বকাপে তামিমের সঙ্গী হওয়ার দাবিটাও আরেকবার জানিয়ে দিলেন ডানহাতি ব্যাটসম্যান। চার নম্বরে নেমে ৯০ রানের ইনিংস খেলে মুশফিক জানিয়ে দিলেন, কেন তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান বলা হয়। চার পেসার মুস্তাফিজুর রহমান, মাশরাফি বিন মুর্তজা, রুবেল হোসেন ও মোহাম্মদ সাইউদ্দিন দারুণ বোলিংয়ে সেরে নিয়েছেন তাদের প্রস্তুতি। কেউই যদিও ১০ ওভারের কোটা পূরণ করেননি। মাশরাফি ছাড়া বাকি তিনজনই পেয়েছেন উইকেট। বড় প্রাপ্তি আছে ভারতের। দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছেন লোকেশ রাহুল। বিশ্বকাপে চার নম্বর পজিশন নিয়ে ভারতের যে দুর্ভাবনা ছিল এতদিন, রাহুলের ১০৮ রানের ইনিংসের পর সেটি অনেকটাই কেটে গেছে। মহেন্দ্র সিং ধোনি ৭৩ বলে সেঞ্চুরি করে জানিয়ে দিয়েছেন, বয়স ৩৭ হলেও এখনো তিনি ফুরিয়ে যাননি। পেসার জাসপ্রিত বুমরাহর ২ উইকেটের পাশাপাশি দুই রিস্ট স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহাল ও কুলদীপ যাদব নিয়েছেন ৩টি করে উইকেট। কার্ডিফের মেঘলা আবহাওয়ায় এদিন টস জিতে বোলিং নিয়েছিলেন মাশরাফি। বৃষ্টির কারণে খেলা শুরু হয়েছিল দশ মিনিট দেরিতে। দুই বল হতেই আবার নামা বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকে প্রায় আধা ঘণ্টা। নতুন বলে বোলিং করা করা মুস্তাফিজ তার দ্বিতীয় ওভারেই শিখর ধাওয়ানকে এলবিডব্লিউ করে বাংলাদেশকে এনে দেন ভালো সূচনা। আরেক ওপেনার রোহিত শর্মা ধুঁকেছেন শুরু থেকেই। রুবেলের বলে আলগা শট খেলতে গিয়ে তিনি বোল্ড হন ১৯ রানে। দ্রুত রান তুলে রানের চাকা সচল রেখেছিলেন অধিনায়ক বিরাট কোহলি। বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আগেই দারুণ এক ইয়র্কারে কোহলিকে (৪৭) বোল্ড করেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। রুবেলের দ্বিতীয় শিকার হয়ে বিজয় শঙ্কর ফেরেন দ্রতই। বাংলাদেশের চার পেসারের দাপটে তখন ১০২ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বেশ চাপে ভারত। মাশরাফি উইকেট না পেলেও টানা ৬ ওভারের স্পেলে খরচ করেন মাত্র ২৩ রান, দুটি ছিল আবার মেডেন ওভার। কিন্তু পেসারদের দাপট ধরে রাখতে পারেননি স্পিনাররা। সাকিব আল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক হোসেনকে দারুণভাবে সামলে নিয়ে বড় জুটি গড়েন রাহুল ও ধোনি। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দুজনই ফিফটি তুলে নেন পঞ্চাশের কম বল খেলে। রাহুল ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তর করেন ৯৪ বলে। ৯৯ বলে ১২ চার ও ৪ ছক্কায় ১০৮ রান করা রাহুলকে ফিরিয়ে ১৬৪ রানের জুটি ভাঙেন পার্টটাইম স্পিনার সাব্বির রহমান। হার্দিক পান্ডিয়াকে ডানা মেলতে দেননি সাকিব। তবে ধোনি ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ভারতকে ঠিকই নিয়ে যান সাড়ে তিনশর ঠিকানায়। ৭৩ বলে সেঞ্চুরির পর ধোনি শেষ ওভারে বোল্ড হন সাকিবের বলে। ৯৯ বলে ১২ চার ও ৪ ছক্কায় ১১৩ রানের ইনিংসটি সাজান ধোনি। বড় লক্ষ্য তাড়ায় তামিমের বিশ্রামে সৌম্য সরকারের সঙ্গে ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমে দলকে ভালো সূচনা এনে দেন লিটন। এরপরই বাংলাদেশ খায় জোড়া ধাক্কা। পরপর দুই বলে হারায় দুই উইকেট। বুমরাহ প্রথমে সৌম্যকে ফিরিয়ে ভাঙেন ৪৯ রানের জুটি, পরের বলে দারুণ ইয়র্কারে বোল্ড সাকিব। এরপর বড় জুটি গড়েন লিটন ও মুশফিক। কিন্তু শুরুতে তাদের রান তোলার গতি ছিল কম। তাতে বেড়ে যায় আস্কিং রানরেটও। জুটি শতরান পেরোনোর পর রান তোলার গতি বাড়ান দুজন। এরপরই আবার জোড়া আঘাত। চাহালের পরপর দুই বলে ফেরেন লিটন ও মোহাম্মদ মিথুন। ৯০ বলে ১০ চারে লিটন করেন ৭৩। মুশফিক এরপর চালিয়ে গেছেন। সেঞ্চুরিটা পাবেন বলেও মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেঞ্চুরি থেকে ১০ রান দূরে থাকতে কুলদীপকে সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হন মুশফিক। ৯৪ বলে ৮ চার ও ২ ছক্কায় সাজান ইনিংসটি। মাহমুদউল্লাহ, সাব্বির, মোসাদ্দেকের কেউই টিকতে পারেননি উইকেটে। ২১৬ রানে ৮ উইকেট হারানোর পর দলের স্কোর আড়াইশ পার হয়েছে মূলত নবম উইকেটে সাইফউদ্দিন ও মিরাজের ৪৬ রানের জুটির কল্যাণে। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচটা ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। ভারতের কাছে হার দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের প্রস্তুতি। অন্যদিকে ভারত প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর জয় দিয়ে প্রস্তুতি শেষ করল। আগামী ২ জুন লন্ডনের বিখ্যাত ওভালে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। ভারতের প্রথম ম্যাচও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, ৬ জুন সাউদাম্পটনে। সংক্ষিপ্ত স্কোর: ভারত: ৫০ ওভারে ৩৫৯/৭ (রোহিত ১৯, ধাওয়ান ১, কোহলি ৪৭, রাহুল ১০৮, শঙ্কর ২, ধোনি ১১৩, পান্ডিয়া ২১, কার্তিক ৭*, জাদেজা ১১*; রুবেল ২/৬২, সাকিব ২/৫৮, মুস্তাফিজ ১/৪৩, সাইফউদ্দিন ১/২৭, সাব্বির ১/৩০)
বাংলাদেশ: ৪৯.৩ ওভারে ২৬৪ (লিটন ৭৩, সৌম্য ২৫, সাকিব ০, মুশফিক ৯০, মিথুন ০, মাহমুদউল্লাহ ৯, সাব্বির ৭, মোসাদ্দেক ০, সাইফউদ্দিন ১৮, মিরাজ ২৭, রুবেল ০*; কুলদীপ ৩/৫৫, চাহাল ৩/৪৭, বুমরাহ ২/২৫)।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ মে ২০১৯/পরাগ