নদীতে ভাসছে অনেকগুলো নৌকা। প্রত্যেক নৌকায় এক একটি পরিবার। যারা ভাসমান জেলে বা ‘মানতা’ নামে পরিচিত।
এ সম্প্রদায়ের মানুষের জন্ম, শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য অর্থাৎ গোটা জীবন কাটে নৌকায়। শুধু মৃত্যুর পর এক খণ্ড জমির প্রয়োজন পড়ে। অনেকের ভাগ্যে তাও জোটে না।
মানতার মানুষের জীবনের গল্প এবং হাসি-কান্না জমে আছে এই নৌকায়। সম্প্রদায়টি নদীর জলে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লড়ছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজুচৌধুরীরহাট, রায়পুর উপজেলার হাজীমারা, কমলনগর উপজেলার মতিরহাট ও রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান জেলে তথা মানতাদের দেখা মেলে। মাছ ধরার ভরা মৌসুমে এসব অঞ্চলে মানতার নৌকার সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানতার নৌকা সাধারণত কোথাও স্থায়ী হয় না। তবে মজুচৌধুরীরহাট এলাকায় শতাধিক মানতা পরিবার ৪০ বছর ধরে রয়েছেন।
এসব নৌকা বহরে দেখা যায়, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন; কেউ করছেন রান্নার কাজ; কেউবা আবার ঘুমাচ্ছেন। মহিলারা একজন অপরজনের মাথায় সিঁথি দিচ্ছেন আর সন্তানের পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন। স্থায়ী জায়গা-জমি না থাকায় এই সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এবং শিশু-বৃদ্ধ একই সঙ্গে নৌকায় বসবাস করেন। সেই নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যান।
সকাল বেলায় নৌকায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মাছ ধরতে যান। নদীর বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরা শেষে বিকেলে সেখানেই ফিরে আসেন। নদীপাড়ের স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ ও খাবার সামগ্রী ক্রয়ের পর তাদের হাতে তেমন কিছু থাকে না। এ জন্য অর্থ সঞ্চয় বলতে কিছু নেই।
এই সম্প্রদায়ের ছকিনা বিবি বলেন, নৌকায়ও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কূপি আর হারিকেনের আলোর পরিবর্তে নৌকায় এখন সৌরবিদ্যুৎ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন মোবাইল ফোনে। তবে বিশুদ্ধ পানি আর স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট। সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকর্মীরা কখনো যান না তাদের কাছে। পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিরোধ সম্পর্কে ধারণা নেই এখানকার নারীদের।
মজুচৌধুরীরহাট এলাকার মানতার সর্দার সোহরাব মাঝি রাইজিংবিডিকে বলেন, বিভিন্ন জেলার নদী ভাঙন এলাকার লোকজন ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে এখানে নৌকায় বসবাস করছেন। নৌকায় এদের অনেকের জন্ম; আবার নৌকায় বহু লোকের মৃত্যুও হয়েছে। স্থানীয় পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পেলেও প্রায় সব নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানতারা। কষ্টের জীবন তাদের।
তিনি বলেন, বেশি সমস্যা হয় কেউ মারা গেলে। ডাঙায় (স্থলে) কবর দেয়ার মতো এক টুকরো জমিও পাওয়া যায় না। ভাসমান জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মত দেন তিনি।
স্থানীয় সমাজকর্মী রিয়াদ হোসেন বলেন, উপকূলীয় বাসিন্দারা নদীগর্ভে ভিটেমাটি হারিয়ে জীবন বাঁচাতে মানতা সম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত তারা। অনিয়ন্ত্রিত প্রসব, বাল্য ও বহু বিবাহ এবং কুসংস্কারে ভরপুর এদের জীবন।
তিনি মনে করেন, কোনো সম্প্রদায়কে পেছনে রেখে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য ভাসমান জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা যথাযথ উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশা করেন।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, অনগ্রসর এই সম্প্রদায়ের মানুষের তালিকা নেই। এজন্য সরকারি সহায়তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পান না তারা। তবে ভবিষ্যতে খোঁজ নিয়ে ভাসমান জেলেদের সহায়তা করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
ঢাকা/বকুল