ক্যাম্পাস

নাৎসি বাহিনী: গণহত্যার কুখ্যাত ইতিহাস

পৃথিবীর সামরিক যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে মানবসভ্যতার ইতিহাসের বিধ্বংসী সব অস্ত্র। অস্ত্রের ব্যবহার, যুদ্ধের ব্যাপ্তি, মানুষের মৃত্যু- সবদিক বিচারে এটিই পৃথিবীর সবচাইতে ভয়াবহতম যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই পৃথিবী নতুন দিকে মোড় নেয়। বিশ্বরাজনীতিতে আসে আমূল পরিবর্তন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কুশীলবদের মধ্যে যার নাম সর্বাগ্রে আসে তিনি আর কেউ নন, বহুল আলোচিত (বোধ করি সমালোচিত শব্দটি ব্যবহারই শ্রেয়) হিটলার৷ ক্ষমতার লোভ ও একগুঁয়ে স্বভাব তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল হিংস্রতার শীর্ষে। হিটলারের হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ এবং পরিকল্পনার মাধ্যম ছিল নাৎসি বাহিনী। এই বাহিনীর নাম শুনলেই সে সময়ের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠতো। মানবহত্যায় কী ভূমিকা ছিল এই বাহিনীর? কাদের দ্বারা পরিচালিত হতো?

নাৎসি বাহিনীর পুরো নাম ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি। এটি মূলত ছিল জার্মানির একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পান। দায়িত্বলাভের পর থেকেই বিরোধী নিধনে মরিয়া হয়ে ওঠেন হিটলার। হিটলার ও তাঁর অনুগত নাৎসি বাহিনী একে একে সব বিরোধীকে নিশ্চিহ্ন করা শুরু করেন। এর মধ্যে ১৯৩৪ সালের ২ আগস্ট জার্মানির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের মৃত্যু হলে, প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলরের ক্ষমতাকে একত্রিত করা হয়। যার ফলে জার্মানির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন হিটলার। এই ঘটনা তাকে আরো বিধ্বংসী করে তোলে। মূলত এই দু’টি ঘটনাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগমনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

১৯৩৪ সালের ১৯ আগস্ট এক গণভোটের মাধ্যমে হিটলার জার্মানির একমাত্র ফিউরার তথা নেতা নির্বাচিত হন। এরপরই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা। ধারণা করা হয়, শুরু থেকেই পৃথিবী শাসনের অভিলাষ ছিল হিটলারের। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ তাকে সেই পথে আরও এগিয়ে দেয়। ক্ষমতালাভের পর থেকেই তিনি জার্মানির সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও চলছিল, যা ছিল মূলত একটি বড় ধরনের যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও নাৎসি পার্টির গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ জার্মানির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থিতিশীল রাখে।

কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে এসব সফলতা থাকলেও বর্ণবাদ এবং জাতিগত বিদ্বেষের কারণে নাৎসি বাহিনীর কুখ্যাতি ছিল জার্মানির নাগরিকদের মধ্যে৷ ফিউরার হিটলার নাৎসি পার্টির মধ্যে ইহুদিদের প্রতি প্রচণ্ড শ্লাঘা জাগিয়ে তোলেন। হিটলারের ব্যক্তিগত ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিফলিত হয় নাৎসি পার্টির সব পদক্ষেপে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পরেও আমরা নাৎসি বাহিনীর এই ভয়ংকর ইহুদিবিদ্বেষ দেখতে পাই।

নাৎসি বাহিনী ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ড আক্রমণ করেন৷ এর মাধ্যমে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪০ সালের মধ্যে ইউরোপের বিশাল অংশ নাৎসি বাহিনীর দখলে চলে আসে। হিটলার তখন নিজেকে পৃথিবীর অবিসংবাদিত যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। যুদ্ধে দেশ দখলের পাশাপাশি ইহুদি নিধনও চলছিল জোরেশোরেই। হিটলারের নাৎসি বাহিনী ইউরোপের শহরগুলো থেকে ইহুদীদের ধরে এনে নিজেদের ক্যাম্পে বন্দি করে রাখে। জানা যায়, জার্মানি নিয়ন্ত্রিত ইউরোপের এসব এলাকায় প্রায় ৪২,৫০০ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ছিল। এই ক্যাম্পগুলোতে নাৎসি বাহিনী ৬০ লক্ষের অধিক ইহুদিকে হত্যা করে।

১৯৪১ সালের ২২ জুন রাত তিনটার পর হিটলারের অনুগত জার্মান বাহিনী রাশিয়া আক্রমণ করে। পরবর্তীতে এটিই হিটলারের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। আক্রমণের ১৭ দিনের মধ্যেই নাৎসি বাহিনী ৩ লাখ রাশিয়ান আর্মিকে আটক করে। রাশিয়ার বিশাল অঞ্চলও হিটলারের অধীনে চলে আসে। কিন্তু পরবর্তীতে রাশিয়ার বৈরী আবহাওয়া এবং রাশিয়ান বাহিনীর তীব্র আক্রমণের কাছে ধরাশায়ী হতে থাকে হিটলারের বাহিনী। ১৯৪৩-৪৪ সালে বিভিন্ন যুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর পরাজয় ঘটতে থাকে।

এদিকে ১৯৪৪ সালে জার্মানিজুড়ে প্রবল বোমাহামলা চালায় রাশিয়ান বাহিনী। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল হিটলার আত্মহত্যা করেন। ৮ মে আত্মসমর্পণ করে নাৎসি বাহিনী। এভাবেই নাৎসিদের ভয়াবহ আগ্রাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অসংখ্য নাৎসিকে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের অধীনে বিচারের আওতায় আনা হয়।

নাৎসি বাহিনী ইউরোপ ও জার্মানির ইহুদিদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চালায়। ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা, আগুনে নিক্ষেপের মতো ন্যাক্কারজনক উৎসবে তারা মত্ত ছিল। কেবল যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বাইরেও ছিল তাদের বিচিত্র সব কাজ কারবার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের উপর চালানো এই গণহত্যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত। আনুমানিক ষাট লাখ ইহুদিকে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই হলোকাস্টে।

নাৎসি পরিচালিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো মৃত্যুদণ্ড এবং ভয়াবহ মানব পরীক্ষার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। এই ক্যাম্পগুলোতেই ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে। মানুষ মারার নানা নিষ্ঠুর কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলত এই ক্যাম্পে। হত্যার আগে পুরুষ বন্দিদের নানারকম ট্যাটু করে দেওয়া হতো, যাতে মৃত্যুর পর তাদের চামড়া দিয়ে আকর্ষণীয় ল্যাম্পশেড, অ্যালবাম ও টেবিল কভার তৈরি করা যায়। মানুষের বুড়ো আঙুলকে ব্যবহার করা হতো আলোর সুইচ হিসেবে।

এরকমই ভয়াবহ আর বিচিত্রতম নির্যাতন চালাতো নাৎসি বাহিনী। তাদের অত্যাচারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। পরবর্তীতে নাৎসি বাহিনীর পতন জনমনে স্বস্তি এনে দেয়। আর নাৎসিদের অবস্থান ঘটে ইতিহাসের জঘন্যতম অংশে। এখনো পৃথিবীর ইতিহাসে নাৎসিরা প্রচণ্ডভাবে ঘৃণিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা/মাহফুজ/মাহি