বিনোদন

সুরের মায়াজালে কালজয়ী শচীন দেববর্মন

‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া/ আমার ভাইধন রে কইয়ো/ নাইওর নিতো বইলা/ তোরা কে যাস কে যাস’—তুমুল শ্রোতাপ্রিয় এই গানের সুরকার ও মূল শিল্পী যে শচীন দেববর্মন, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। শুধু কি তাই, এই গানের রচয়িতা তারই সহধর্মিণী প্রখ্যাত গীতিকার ও সংগীতশিল্পী মীরা দেববর্মন।

ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মানিক্য রাজপরিবারের সন্তান শচীন দেববর্মন। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লায় তার জন্ম। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণের কাছে সংগীত শিক্ষা শুরু। তৎকালীন ত্রিপুরার অন্তর্গত কুমিল্লার রাজপরিবারের নয় সন্তানের মধ্যে শচীন দেববর্মন ছিলেন অন্যতম। মা মণিপুরি রাজবংশের মেয়ে নিরুপমা দেবী। ১৯২০ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন শচীন। ১৯২২ সালে ওই কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে স্নাতকে ভর্তি হন। ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে ভর্তি হন এই শিল্পী।

১৯৩৪ সালে অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্সে গান গেয়ে সবার নজরকাড়েন শচীন দেববর্মন। সর্বভারতীয় এই সংগীত সম্মেলনে গান গেয়ে শচীন দেব স্বর্ণপদক জয় করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরি পেশ করে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে মুগ্ধ করেছিলেন তিনি। শচীন দেববর্মন সংগীত শিক্ষার জন্য অনেকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—কানাকেষ্ট, ওস্তাদ আফতাবউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, আব্দুল করিম খাঁ প্রমুখ।

১৯৩৭ সাল শচীন দেববর্মনের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর তিনি তার পরবর্তী সংগীত জীবনের প্রেরণা শ্রীমতি মীরা দাশগুপ্তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার নাম বদলে রাখা হয় মীরা দেববর্মন। মীরা দেববর্মন ছিলেন তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস রায় বাহাদুর কমলনাথ দাশগুপ্তের নাতনি।

মীরা আর শচীন দেবের বিয়ে নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শচীন দেব ও মীরা দেববর্মন তালিম নিতেন। একসঙ্গে সংগীতের পাঠ নিতে নিতে একসময় তারা প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হন, যা গুরু ভীষ্মদেব ভালো চোখে দেখেননি। এরপর ভীষ্মদেবের সঙ্গে শচীন দেবের সম্পর্ক শিথিল হতে শুরু করে। সর্বশেষ ভীষ্মদেব সব ছেড়েছুড়ে পন্ডিচেরির দিকে রওনা হন।

তারপর মীরা দেববর্মন শচীন কর্তার কাছে সংগীতের দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন। একই বছর তাদের বিয়েও হয়। স্বামীর মতো তিনিও ছিলেন সংগীতের জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সফল ব্যক্তিত্ব। বিয়ের দুই বছর বাদে তাদের একটি সন্তান হয়। সে-ও পরবর্তীতে বাবার মতো সুরজগতের প্রবাদপুরুষ হয়ে উঠেছিলেন। বলছি, রাহুল দেববর্মনের কথা।

শচীন দেববর্মনের প্রাপ্তি ঝুলি মোটেও কম নয়। ১৯৩৪ সালে থেকে এই প্রাপ্তির শুরু। তারপর এক এক করে ফিল্মফেয়ার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ডসহ কত কী তার ইয়াত্তা নেই! ১৯৬৯ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী লাভ করেন শচীন দেববর্মন। পরের বছর শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’ সিনেমায় ‘হোগি তেরি আরাধনা’ গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্লে-ব্যাক গায়ক পুরস্কার লাভ করেন শচীন। এর চার বছর পর ‘জিন্দেগী জিন্দেগী’ সিনেমার সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭৫ সালে প্যারালিটিক স্ট্রোক হয় শচীন দেববর্মনের। তারপর দীর্ঘ পাঁচ মাস কোমায় ছিলেন তিনি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই শিল্পী। তার মৃত্যুর এত বছর পরও সুরের মায়া জালে বেঁচে আছেন কিংবদন্তি শচীন দেববর্মন।