ঠিক দুপুর, কাঠফাটা রোদ। চারদিকে সুনসান নীরবতা। কোথাও তেমন কর্মচঞ্চলতা নেই। রাস্তায়ও যানবাহন নেই বললেই চলে। এমন সময় পথের ধারে একটি বুক সেলফের দেখা মিললো। তাক ভর্তি বই। পাশেই দাঁড়িয়ে কেউ বই পড়ছেন, আর কেউবা নিজের পছন্দমতো বই খুঁজছেন। দৃশ্যটি পথের পাঠাগারের। পথচারীদের জন্য ব্যতিক্রমী এই পাঠাগারটি গড়ে উঠেছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে।
উপজেলা শহরের ক্যান্টনমেন্ট সিএসডি মোড় এলাকার গোল চত্বরে গেলে দেখা মিলবে এ পাঠাগারের। কর্মব্যস্ত জীবনে একটুখানি বিশ্রামের ফাঁকে এই পাঠাগারটি যেন পথচারীদের একমাত্র বিনোদনের খোরাক। তাই তো দুপুরেও কয়েকজন বইপ্রেমীকে দেখা গেলো পড়ার নেশায় বুদ হতে। অল্প সময়ে সাড়া জাগানো উন্মুক্ত এই পাঠাগারটি সর্বক্ষণই পথচারীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকে।
পাঠাগার আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ এই পাঠাগারটি গড়ে তুলেছে। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি অর্ধশতাধিক বই নিয়ে পাঠাগারটি উদ্বোধন করা হয়। প্রথম থেকেই ভিন্নধর্মী পাঠাগারটি যেন পথচারীদের আগ্রহের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। সৈয়দপুরের বইপ্রেমীদের অনেকেই প্রতিদিন নিয়ম করে একবার করে হলেও পথের পাঠাগারে আসেন। নিরিবিলি কিছুটা সময় বই পড়াতে মগ্ন থাকেন। এখানে আছে ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মীয় ও মনীষীদের জীবনীর উপরে বিভিন্ন বই।
ধীরে ধীরে সৈয়দপুরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া এই পাঠাগারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে হৃদয়ে সৈয়দপুরের সদস্যরা। তারা এখানে প্রত্যেক মাসে নতুন বইয়ের ব্যবস্থা করেন। নিয়মিত পত্রিকাও রাখেন। পাঠকদেরও কেউ কেউ নিজের সংগ্রহে থাকা বই পথের পাঠাগারে এনে দেন।
এখানে আছে একটি রেজিস্ট্রেশন খাতা। পথচারীদের যে কেউ এই পাঠাগারের সদস্য হতে পারবেন। নাম নিবন্ধন করে বাড়িতে নিয়ে গিয়েও বই পড়ার সুযোগ পাবেন। সর্বসাধারণকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা এই পাঠাগারটিকে এখন পথচারীরা নিজের করে নিয়েছেন। পরম যত্ন আর গভীর ভালোবাসায় পথের পাঠাগারকে আগলে রাখার কাজটা পথচারীরাই করে যাচ্ছেন।
পাঠাগারের একজন নিয়মিত পাঠক মেরিনা আক্তার মৌলি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। চলার পথে ব্যতিক্রমী এই পাঠাগারটি দেখে আমরা সবাই নতুন করে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। যান্ত্রিক জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও বই পড়ার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করার চেষ্টা করছি।’
হৃদয়ে সৈয়দপুরের পথের পাঠাগারের আরেক পাঠক মুন্না সরকার বলেন, ‘পথচারীদের জন্য গড়ে ওঠা এই পাঠাগারটিকে আগলে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। এ কারণে আমি নিজের সংগ্রহে থাকা কিছু বই পাঠাগারে দিয়েছি।’
পাঠাগারের প্রধান উদ্যোক্তা ‘হৃদয়ে সৈয়দপুর’ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সোহেল রানা বলেন, ‘প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় স্মার্টফোন এখন হাতে হাতে। বর্তমানে সবাই ব্যস্ত ইন্টারনেট দুনিয়ায়। আগের মতো বই পড়ার অভ্যাস এখন ক’জনেরই বা আছে। এজন্য পথের মাঝে উন্মুক্ত পাঠাগার গড়ে তুলে সবাইকে বই পড়তে উৎসাহিত করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য।’
বইপ্রেমী সোহেল রানা আরও বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে আমাদের এই পথের পাঠাগারটি সৈয়দপুরে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পাঠাগারের কিছু নিয়মিত পাঠকও তৈরি হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা সৈয়দপুরে আরও কিছু পথের পাঠাগার গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
লেখক: শিক্ষার্থী ও ফিচার লেখক।