পজিটিভ বাংলাদেশ

আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে ২ বোনের শিল্পকর্ম 

শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলোতে অনেকেই আসছেন, দেখছেন আবার সংগ্রহও করছেন। এমনকি জন্মদিন, বিয়ে, কোনো বার্ষিকীসহ বিভিন্ন উৎসবে বা আয়োজনে অনেকেই গতানুতিক উপহারের বদলে এখান থেকে কিনে নানা শিল্পকর্ম উপহার দিচ্ছেন। 

করোনার অবসন্নতা কাটাতে লক্ষ্মীপুরের কলেজে পড়ুয়া দুই বোনের এমন শিল্পকর্মে মুগ্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয়সহ দেশি-বিদেশি ক্রেতারা। শখের বশে দুই বোনের রঙ-তুলিতে ক্যানভাস রাঙানোর নৈপুণ্যতা দেখে চিত্রকর্মে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এখানকার অন্য তরুণীরাও। তাদের এই চিত্রকর্ম আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও যাচ্ছে বলে জানান তারা।

প্রতিভাবান এই দুই বোন হলেন তাসনিম আর তাফহিম। জেলা শহরের মজুপুরে অবস্থিত তাদের বাসার পড়ার কক্ষটা এখন যেন চারুকারু শিল্পের এক মিনি প্রতিষ্ঠান। তারা লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের উত্তর মজুপুর এলাকায় ভাড়া থাকেন। চাকরিজীবী বাবা ফজলুর রহিম মাহমুদের বড় মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা তাসনিম ও ছোট মেয়ে রুবাইয়া আক্তার তাফহিম। তাসনিম লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অ্যাকাউন্টিং বিভাগে আর তাফহিম লক্ষ্মীপুর শ্যামলী আইডিয়াল টেকনিক্যাল কলেজে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা করছেন। তাদের মা নাসিমা আক্তার একজন স্কুল শিক্ষিকা। তবে তারা স্থানীয়ভাবে একটা চারুকারু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন বলে জানান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাসার ড্রয়িং রুমটা যেন চিত্রকর্মের এক্সিবিশন ফ্লোর। পড়ার রুমটা এখন যেন শিল্পকর্মের প্রতিষ্ঠান। আশেপাশের তরুণীদের কাজ শেখাতে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। শিল্পকর্ম মানেই উচ্চমূল্য। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা পাল্টাতেই তারা কাজ করছেন।

দুই বোন রাইজিংবিডিকে জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা রঙ-তুলির চিত্রকর্ম শিখেছিলেন ছোটবেলায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়, দাদার কাছে। এরপর বড় বোনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও মনোবলে আগ্রহী হয়ে উঠেন ছোট বোন তাফহিম। দু’বোন মাঝেমধ্যে সময় পেলে টুকটাক আঁকতেন। সেগুলো নিজেদের ঘরে শোভা পেত আর মনের খোরাক মেটাতো। মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষা আর ভালো চাকরি করা। কিন্তু গত বছর থেকে মহামারি করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তারা চিত্রকর্মে মনোযোগী হয়ে উঠেন। বেশ কিছু কাজ করে ফেসবুক পেজ খুলে সেখানে তা ছড়িয়ে দেন। সেগুলো দেখে মুগ্ধ হন দেশ-বিদেশের দর্শক। অনলাইনে অর্ডার আসে। এক দুই করে অনেক অর্ডার আসতে থাকে। তারা আরও উদ্বুদ্ধ হন। বেশ উপার্জনও আসে তাদের। এভাবে বাড়তে থাকে কাজের পরিধি। 

তাদের কাজে একে একে যোগ হয় অয়েল পেইন্টিং, মান্ডালা ড্রয়িং, ডুডল আর্ট, ক্যালিগ্রাফি, ক্র্যাফট ডিজাইন, টাইফোগ্রাফি। টিশার্ট, শাড়ি, বোরকা, জামা ইত্যাদি তাদের রঙ-তুলির শৈল্পিক ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে মনোমুগ্ধকর। আসে অর্ডার। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী শিক্ষার্থী ও বেকার নারীরা তাদের কাছে চিত্রশিল্পের এ কাজ শেখার আগ্রহ নিয়ে ছুটে আসছেন। এরইমধ্যে অনলাইনে একটি বিদেশি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কেপিআর অ্যাওয়ার্ড আর্ট কম্পিটিশন-২ সম্মাননা সনদ অর্জন করেন তারা। আঁকাআঁকিতে তাদের ব্যবহৃত মিডিয়া: আর্কিলিক অন ক্যানভাস। 

সম্প্রতি আমেরিকায় পাঁচটি আঁকা ছবি বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। তাদের আঁকা চিত্রকর্ম প্রকারভেদে ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। এতে মাসিক ৭০-৮০ হাজার টাকা আয় বলেও জানান এ দুই বোন।

বর্তমানে তাদের বাসায় ১৫ জন শিক্ষার্থীকে শেখাচ্ছেন এই শিল্পকর্ম। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা জানালেন, ব্যাপক উৎসাহ ও স্বপ্ন নিয়ে শিখছেন তারাও। আর চিত্রকর্মের গ্রাহকরা মুগ্ধ হয়ে তাদের এ কাজকে সাধুবাদ জানান।

বেসরকারি এনজিও সংস্থা সিডাব্লিউডিএ’র নির্বাহী পরিচালক পারভীন হালিম বলেন, লক্ষ্মীপুরে নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অভাব রয়েছে। নারীরা নতুন কাজে আগ্রহী হলেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে তেমন সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এসময় লক্ষ্মীপুরে একটি লেডিস ক্লাব, নারীদের জন্য শপিংমলসহ নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।