ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। শরৎ শেষপ্রায়। প্রকৃতিতে এখনি শীত আবহ। আর কিছুদিন পরেই হয়ত শীতের আবরণে ছেয়ে যাবে দেশ। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে দেশীয় পণ্যের বাজারে অনেক ব্যবসায়ী বা তাঁতীরা শাল এবং শালের বুনন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
শীতের পোশাকের মধ্যে ব্যক্তি বিশেষে বাঙালি নারীর চাহিদা অনুযায়ী শালের নকশায় দেখা যায় ভিন্নতা। যেমন- মনিপুরী, জামদানি, বাটিক, খেশের মতো শালের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। শপিংমলের পাশাপাশি অনলাইন উদ্যোক্তারাও তাদের কালেকশনে রেখে দিয়েছে বিভিন্ন ডিজাইনের দেশীয় শাল। দেশীয় সংস্কৃতির নকশায় করা ডিজাইন একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি হয় আমাদের দেশেই।
দেশীয় শালের এমন প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে ই-কমার্স সেক্টর। বর্তমানে অনলাইনে দেশীয় শালের প্রচারণা নিয়ে উদ্যোক্তারা বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এরফলে অনলাইনে দেশি শালের প্রচারণা বাড়ছে। অনলাইন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ভাদ্র মাসের গরমেও তারা অনলাইনে শাল বিক্রি করেছেন। আসুন, তাদের মূল্যবান মন্তব্যের মাধ্যমে আমরা জেনে নিতে পারি অনলাইনে দেশি শালের প্রচারে করণীয় সম্পর্কে-
কাকলী তালুকদার (স্বত্বাধিকারী, কাকলী'স এট্যায়ার)
অনলাইনে দেশি পণ্যের ই-কমার্স যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা আমাদের সবার জন্য সফলতা নিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি। অনলাইনে দেশীয় পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি পণ্য হচ্ছে দেশীয় শাল। যদিও এক বছর আগে অনলাইনে বিদেশি শালের দৌরাত্ম ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমানে দেশি শালের জন্য তা কমতে শুরু করেছে। অনলাইনে দেশীয় শালের প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হলে আমাদের করণীয় হচ্ছে, শাল নিয়ে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। নিজ উদ্যোগের দেশীয় শাল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট তৈরি এবং নিজেদের উদ্যোগের পেজ, গ্রুপ এবং পার্সোনাল প্রোফাইলে দেশি শালের কথা তুলে ধরতে হবে।
আমাদের দেশে অনেক ধরনের শাল রয়েছে। গত এক বছরে ৩০-৪০ প্রকারের দেশীয় শাল সম্পর্কে আমরা জেনেছি। এই শালগুলো যেসব জায়গায় তৈরি হচ্ছে এ নিয়ে আলোচনা ও এসব শালের সুন্দর সুন্দর ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে অনলাইনে মিডিয়া প্রচার বাড়াতে হবে। এ বছর এখনো শীত আসতে মাসখানেক বাকি কিন্তু এখনি আমাদের অনেকের উদ্যোগে শাল বিক্রি হচ্ছে। কারণ আমরা শাল নিয়ে এখন থেকেই কাজ করছি। অর্থাৎ অনলাইনে দেশীয় শালের প্রচার বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে নিয়মিত শাল নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
নিগার ফাতেমা (স্বত্বাধিকারী, আরিয়া’স কালেকশন)
খেশ নিয়ে কাজ করার মধ্যে খেশের শাল ছিল আমার উদ্যোগের অন্যতম ইনোভেশন। অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে গত বছর খেশের শাল নিয়ে কাজ শুরু করি। চ্যালেঞ্জ বলছি- কারণ, যেখানে খেশ পণ্য সম্পর্কে ক্রেতার তেমন ধারণা ছিল না, সেখানে আমি শাল নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। গত বছর থেকেই অনলাইনে দেশীয় শালের প্রচার অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে যার জন্য ক্রেতারা এখন দেশীয় শাল কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শালের বাজারে মূলত বিদেশি শালের প্রভাব ছিল বেশি। অথচ আজকে যদি আমরা দেখি গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশীয় শাল বিক্রি শুরু হয়ে গেছে গরমকালে। অর্থাৎ আমরা সবাই মিলে বাজারে দেশীয় শালের প্রচার বৃদ্ধি করতে পেরেছি বলেই এমনটা হয়েছে। অনলাইনে দেশি পণ্যের ই-কমার্স দেশীয় বিভিন্ন পণ্যের সাথে সাথে দেশীয় খেশ শালের চাহিদাও বৃদ্ধি করতে পেরেছে অনেকটা।
তবে এদিকে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। অনলাইনে খেশ নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তার সংখ্যা কম। যদি উদ্যোক্তার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায় তাহলে আগামীতে আমরা আরও বেশি বাজারে খেশ শালের চাহিদা দেখতে পারব। উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে খেশ শাল নিয়ে অনলাইনে কন্টেন্ট বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে বিভিন্ন ডিজাইনের খেশ শাল আমরা দেখতে পাব, যা খেশ শালের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অনলাইনে খেশের বিভিন্ন ধরনের শালের ছবির সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। যদি এই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া হয় তাহলে আমি নিগার ফাতেমা একজন খেশ উদ্যোক্তা হিসেবে বলতে পারি সম্ভাবনাময় খেশ শালের চাহিদা অনলাইনে অনেক বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে দেশীয় শালের বাজারে তা উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখতে পারবে বলে আমি মনে করি ।
উম্মে শাহেরা এনিকা (স্বত্বাধিকারী, তেজস্বী)
প্রচারের অভাবে আমাদের অনেকেরই জানা ছিলো না, আমাদের দেশেই প্রায় ৪০ ধরনের শাল তৈরি হয়। গত বছর ই-ক্যাবের (ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ স্যার অনলাইনে দেশীয় শালের ওয়েভ শুরু করার পর আমরা জামদানি মোটিফ, খেশ, মণিপুরী, হ্যান্ডপেইন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, বাটিক, ব্লক, খাদি, বম, হাতের কাজের শালের নাম জানতে পেরেছি।
এখন আমরা যারা অনলাইনে শাল নিয়ে কাজ করছি, তাদের প্রত্যেকের উচিত শীত আসার কমপক্ষে ২-৩ মাস আগে থেকে নিজের প্রোফাইলে শাল নিয়ে লেখা। আমাদের দেশের শালগুলোর গুণগত মান নিয়ে বেশি বেশি প্রচার করা কন্টেন্টের মাধ্যমে। এছাড়াও দেশীয় শালের ক্রেতাদের সম্মানিত করা, তাদের নিয়ে ইভেন্টের আয়োজন করা। এর ফলে শালের ক্রেতারা আরো বেশি বেশি দেশীয় শালের প্রতি আগ্রহী হবে। দেশ ছাড়াও প্রবাসী ক্রেতাদের আগ্রহী করার জন্য সারাবছর শাল নিয়ে প্রচার করা যেতে পারে।
সিরাজুম মুনিরা (স্বত্বাধিকারী, আবায়া স্টোরি)
দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করার ফলে প্রতিনিয়ত বুঝতে পারছি উদ্যোক্তাদের পণ্যের সমৃদ্ধ কন্টেন্টের প্রয়োজনীয়তা। বিগত বছরের তুলনায় বিভিন্ন জেলার উদ্যোক্তা ও ক্রেতাদের শাল নিয়ে লেখা ও ছবির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় শালের তথ্য উঠে এসেছে এবছর।
যেমন ভিসকস ম্যাটেরিয়ালের আড়ং শালগুলোতেই হ্যান্ড পেইন্ট, স্ক্রিন প্রিন্টসহ ব্লক, বাটিক সব কিছুর মাধ্যমে আলাদা ভাবে তৈরি করা সম্ভব, যা আগে অজানা ছিল। দেশীয় শালগুলো নিয়ে যত প্রচার বাড়বে, ছবি আসবে অনলাইনে, রিভিউ দিয়ে অনুপ্রাণিত করবে একে অন্যকে কিনতে, ততই এর প্রচার বাড়বে ইনশাআল্লাহ।
সালমা নেহা (স্বত্বাধিকারী টেস্টবিডি)
সঠিক প্রচার ও প্রসারের অভাবে আমাদের দেশীয় শালের বাজার তুলনামূলক অনেক ছোট ছিলো। কিন্তু গত বছর বিদেশি শালের রমরমা বাজার থেকে বেরিয়ে দেশীয় শাল নিয়ে ওয়েভের মাধ্যমে প্রচারণা বেড়েছে। শালের উদ্যোক্তাগণ সকলে যদি কন্টেন্টের দিকে মনযোগী হয় এবং দেশীয় শাল নিয়ে সঠিক তথ্য প্রদান করে সকলকে উৎসাহী করে তুলতে পারে তাহলে এর চাহিদা বাড়বে। এছাড়াও দেশীয় শালের ক্রেতাদের সম্মান জানাতে হবে। যখন একজন শালের ক্রেতাকে সম্মানিত করা হবে তখন আরো কয়েকজন দেশীয় শাল কিনতে আগ্রহী হবে। এছাড়াও বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতারাও যদি এর সঠিক মূল্যায়ন করে এবং রিভিউ এর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করে তবে এর প্রচার অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। কয়েকজন শালের উদ্যোক্তা মিলে শালের ইভেন্ট করলেও ক্রেতারা একসাথে অনেক ধরনের শাল সম্পর্কে জানতে ও দেখতে পারবেন। মানুষ যত বেশি জানবে দেশীয় শাল ক্রয় করতে তত বেশি আগ্রহী হবে।
সেই সঙ্গে দেশীয় শালের প্রচারে মিডিয়ার ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কারণ, যে কোন পণ্য নিয়ে মিডিয়াতে যত বেশি সঠিক তথ্য প্রচার হয় সেই পণ্যের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ে। সকলে মিলে দেশীয় শালের প্রচারের চেষ্টার ফলেই একদিন বিশ্ববাজারেও আমাদের দেশীয় শালগুলো দাপটের সঙ্গে মার্কেট দখল করবে ইনশাআল্লাহ।