সমুদ্র এখানে শান্ত। বুক চিতিয়ে গর্জন তোলে না উত্তাল ঢেউয়েরা। ভাটির টানে জল নেমে যাওয়ার পরে বালুকাবেলার আয়নায় ক্ষণে ক্ষণে নিজের রূপ দেখে নেয় পড়ন্ত সূর্য। মর্জিমতো সাজও বদলায়। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সমুদ্রে ডুব দেওয়ার আগে কখনো সে টকটকে লাল, কখনো হলুদ। বহু দূর থেকে ঠিকরে রূপসী রোদের আলো পড়ছে পানিতে, বালিতে। মুগ্ধ হয়ে নিঝুম দ্বীপের সেই দৃশ্য দেখছেন গুটিকয়েক দর্শনার্থী। স্থানীয়রা জায়গাটিকে চেনেন চর উসমান হিসেবে।
সমুদ্রের শান্ত জলে মাছ ধরার নৌকা ছুটে বেড়াচ্ছে। পেছনে কেউড়া বন। সবুজ অরণ্যের পথ পেরিয়ে ইট বিছানো রাস্তা পড়েছে সোজা সমুদ্র পাড়ে। প্রায় ৩ কিলোমিটার লম্বা আর প্রশস্ত বালিঘেরা এই সৈকতে এসে দাঁড়ালে যে অনুভূতি ঘিরে ধরে, তার নাম মুগ্ধতা। তটজুড়ে লাজুক কাঁকড়ার বালি দিয়ে গড়া ছন্দবদ্ধ আলপনা। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই প্লাস্টিক, চায়ের কাপ। নোয়াখালীর দ্বীপ হাতিয়া উপজেলার আরেকটি দ্বীপ এটি। যাতায়াতের সুবিধা ভালো না হওয়ায় জনসমাগম নেই বললেই চলে। স্থানীয়রা বলছেন, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো থাকলে হয়তো আরো ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসতেন।
কদাচিৎ মোটরসাইকেলের দেখা পেলেও অন্য কোনো মোটরযান নেই-ই বলা চলে। ব্যক্তি উদ্যোগে সমুদ্রের ভেতরে কয়েকশো গজ পর্যন্ত কাঠের সাঁকো। দেখা মেলেনি সমুদ্রস্নানের উৎসাহী মানুষ। নিকট থেকে দেখেই চোখের ক্লান্তি দূর করছেন সকলে।
জোয়ারের সময় এখানে পানি চলে আসে তীরের কাছাকাছি। সেখানে ছোট্ট সংযোগ খাল বেয়ে চলে আঁকাবাঁকা। জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের সঙ্গে স্থানীয়দের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ বোঝা যায় উঁচু সড়ক আর পুরনো ঝড়ের আঘাতের ধ্বংসস্তুপ দেখে। এ তথ্য জানালেন সমুদ্র পাড়ের নামার বাজারের এক বাসিন্দাও। সমুদ্রের সংযোগ খালের পাড়ে সারিবাঁধা মাছ ধরার সাম্পানের পাশাপাশি কিছু নৌকায় চলছে মেরামতের কাজ। দিন কয়েক পরেই ছোট-বড় ফেইস্সা, পোয়াসহ সামুদ্রিক মাছের জন্য গভীর সমুদ্রে ভাসবে এসব বড় বড় নৌকা। একেকটা কাঠের নৌকার মূল্যমান শহুরে মাঝারি মাপের লঞ্চের চাইতেও বেশি!
হাতিয়ার মুক্তারিয়া ঘাট থেকে স্পীডবোট যোগে বন্দরটিলা ঘাটে আসেন রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ। ঝাউবনে তাবু গেড়ে সূর্যের উদয়-অস্ত দেখেন। সেখানে পোষা প্রাণীর মতো কখনো কখনো ছোঁয়ার দূরত্বে চলে আসে হরিণ-হরিণী। দিনভর সেসব দেখা শেষে পর সন্ধ্যা শেষে প্রায় সবাই ফিরে যান ঘরে। রাত্রিযাপনে সরকারি রিসোর্টসহ বেসরকারি বহু ঘর মেলে অল্প খরচেই। মানুষেরাও যেনো সমুদ্রের মতোই শান্ত ও সরল।
তবে সমুদ্র উত্তাল হয় চৈত-বৈশাখে। ভয়াল সৈকতে তখন আনাগোনা শুধুই তার পাড়ের সন্তানদের। পর্যটক তখন আসে না বললেই চলে। জানালেন সৈকতপাড়ের একমাত্র চায়ের দোকানি এনায়েত।
যান্ত্রিক কোলাহল থেকে অনেক দূরে। ইচ্ছে করলেই হারিয়ে যাওয়া যাবে গহীন বনে। সমুদ্র বিলাস করা যাবে বালু পাড়ে বসে। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর জানা অজানা পাখির কলরবে যে হৃদয়ের বিশ্রাম। তার নাম দেয়া যায় 'স্নিগ্ধতা'।