গ্রন্থাগার হলো মহামানবদের সঙ্গে মিলনের স্থান। যেখানে জ্ঞান, তথ্য ও মানুষের অন্তরাত্মার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। চাঁদপুরের গণগ্রন্থাগারটি একসময় চৌধুরীঘাটের একটি জড়াজীর্ণ স্থানে ছিল। পরবর্তী সময়ে শহরের বিটিরোডে নিরিবিলি পরিবেশে ২২ শতক জায়গাজুড়ে স্থাপিত হয়। আধুনিক এই সরকারি পাঠাগারের নিয়মিত পাঠকরা পাচ্ছেন নানা সুযোগ-সুবিধা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহরের অদূরে স্থাপিত প্রায় ৫ হাজার স্কয়ার ফিটের তিনতলা গণগ্রন্থাগারে পাঠকরা মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। আর তাদের সেবায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচামচারিরা।
এবিষয়ে চাঁদপুর সরকারি গণগ্রন্থাগারের অফিস সহায়ক আব্দুল করিম মানিক বলেন, আগে শহরের চৌধুরীঘাট এলাকায় একটি জড়াজীর্ণ ভাড়া করা ভবনে গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম চলতো। সেখানে যানজট, মানুষের হৈচৈ ও নানা শব্দে পাঠকদের পড়তে সমস্যা হতো। এখানে নিরিবিলি পরিবেশ থাকায় নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে।
সহকারী লাইব্রেরিয়ান উম্মে রায়হানা ফেরদৌস বলেন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, নারী পাঠকদের জন্য গণগ্রন্থাগারটিতে নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাদে প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বই পড়তে আসছেন পাঠকরা। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমেও প্রায় ৩২জন এখান থেকে ধার করে বই নিয়ে পড়ছেন। আমরা পাঠের পরিবেশ সুন্দর রাখতে সবসময় তৎপর থাকি।
২০০ আসনবিশিষ্ট আধুনিক অডিটোরিয়াম ছাড়াও ভবনটিতে সাধারণ পাঠকক্ষ, রেফারেন্স পাঠকক্ষ ও শিশুদের জন্য পৃথক পাঠকক্ষ রয়েছে। ইতিহাস, দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে সারিবদ্ধভাবে রাখা প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি বই সংরক্ষিত রয়েছে। তাই চাকরিপ্রার্থীসহ ৩০/৪০জন শিক্ষার্থী নিয়মিতই এখানে এসে বই পড়ছেন।
নিয়মিত পাঠক দেওয়ান ফাহাদ বিন শরিফ, মো. জসীম, মুরাদ হোসাইনসহ অন্যরা বলেন, শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ হওয়ায় এখানে বই পড়তে আসি। সবরকমের বই এখানে রয়েছে। চাকরির বইগুলো এখানে পাওয়ায় খুব ভালো হয়েছে।
খোঁজ- খবর নিয়ে জানা যায়, এই গণগ্রন্থাগারের আওতায় ৩ হাজার বই সম্বলিত একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি রয়েছে। সেখানেও পাঠক সদস্য রয়েছেন হাজারেও বেশি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে গণগ্রন্থাগারের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা জেলা সদরে সোম ও শুক্রবার দুইদিন এবং অন্য উপজেলাগুলোতে ১ দিন করে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়ি নিয়ে যাই। উপজেলাগুলোতে ৬ ঘণ্টা থাকলেও জেলা সদর ও শহরে তার চেয়েও বেশি সময় আমরা পাঠকদের চাহিদা মেটাতে অবস্থান করি। এখানের বেশিরভাগ পাঠক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির বইগুলো বাসায় নিয়ে পড়ছেন।
এদিকে জেলার বেসরকারি নিবন্ধিত পাঠাগারগুলোকে সহযোগিতা এবং এই গণগ্রন্থাগারের জন্য নতুন পাঠক সৃষ্টিতে নানা পরিকল্পনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান চাঁদপুর লাইব্রেরিয়ান রাফিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, আমরা গ্রন্থাগার সেবা মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতে সেমিনার ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। শিশুদের জন্য শেখ রাসেল কর্নারসহ বিভিন্ন খেলনাসামগ্রী দিয়ে আলাদা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও রচনা প্রতিযোগিতা রাখার চেষ্টা করছি। তা ছাড়াও, বেসরকারি লাইব্রেরিগুলো পরিদর্শন করে নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের সহযোগিতা এবং উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই নান্দনিক ভবনটি সুন্দরভাবে পাঠকদের জন্য স্থাপন করে দিতে পেরে আনন্দিত বলে জানান গণপূর্ত বিভাগ চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রকিবুর রহমান। তিনি বলেন, ২০১৯ সালেই আমরা আধুনিক এই গণগ্রন্থাগার ভবনটি হস্তান্তর করেছি। এটি উদ্বোধন করেছেন এই আসনের সংসদ সদস্য ডা. দীপু মনি। গণগ্রন্থাগার নির্মাণের মধ্য দিয়ে চাঁদপুরবাসীর প্রাণের দাবি পূরণ হয়েছে। এখানে পাঠকরা বই পড়ছেন দেখে আমাদেরও ভালো লাগছে।