ভ্রমণ

হিমালয়ের তীর্থন নদীর বনে 

পাহাড়ি নারীটির স্বর্ণের কানের দুল দেখে তাকিয়েই আছি। বড়সড় একটা রিং আর রিং-জুড়ে নানান নকশা। এদেশের হিসেবে অতি সাধারণ। অন্যান্য অভিজাত নারীরা আরও জমকালো কানের দুল পরেন। কিন্তু এই গ্রামের অচেনা নারীর অতি সাধারণ কানের দুল, গায়ের সবুজ জামা হিমালয়ের জঙ্গলের সাথে মিলেমিশে গিয়েছে।  আমি যাচ্ছি গ্রেট হিমালায়ান ন্যাশনাল পার্ক। ভারতের হিমাচল প্রদেশের একটি বনভূমি। পার্কের গেইট থেকে একা একাই ট্রেক করতে হবে৷

গেইটের প্রবেশপথে এই নারীর সঙ্গে দেখা। এক বান্ধবী নিয়ে এদিকটায় এসেছেন, বেড়াতে যাচ্ছেন আত্মীয়ের বাড়িতে। তাঁর নিজের বাড়ি যে গ্রামে তার নাম লাবাহ। বড় রাস্তায় বাস চলে দিনে দুটো। খুঁজলে শেয়ারের ট্যাক্সিও পেয়ে যেতে পারেন। হিন্দী খুব একটা বলতে পারেন না, এদের ভাষা পাহাড়ি। অবশ্য ভাষাটি হিন্দীর কাছাকাছি। বুঝতে অসুবিধে হয় না। তাঁরা যাবেন একটা অনুষ্ঠানে। গায়ে সিল্কের জামা আর স্কার্ট। তাঁর গায়ের কোটের সঙ্গে বনভূমির সবুজ মিশে আছে। নিজেই বিশাল ওক, বার্চ, পাইন বনাঞ্চলের কোমলতা বয়ে চলছেন। তাঁকে পাশ কাটানো মুশকিল। 

আমি এসেছি মানালি থেকে। মানালিতে দু'দিন কাটিয়ে এদিকে এলাম। খুব কম ট্যুরিস্ট এখানে আসেন। বেশিরভাগই রোহতাং পাস আর সোলাং ভ্যালি দেখে চলে যান। এখন গ্রীষ্মকাল হলেও আমি দুটো দিন ঠান্ডার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিলাম। আর বিয়াস নদীর আশেপাশে ঘুরঘুর করলাম। মাঝে মাঝে দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে নদী এমনভাবে বয়ে যায় যেন সে অন্য কাউকে চেনেই না- উন্মত্ত, উত্তাল আবার একই সাথে টলোমল করে অভিমানে। পাহাড়ি নদী আমাদের দেশের নদীর মতো কূল নাই কিনার নাই অবস্থায় থাকে না। অন্য কূল দেখা যায় কিন্তু এই অবিচল সবুজ পাহাড় আর বনভূমির মাঝে বয়ে যাওয়া রূপসী প্রতিবেশী মাঝে মাঝে ভয়ানক স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু। শীতকালে যখন বরফে ঢেকে যায় আশপাশ তখন নিজেই বরফদের জন্য গান গায়। 

গ্রেট হিমালায়ান ন্যাশনাল পার্ক যেতে হলে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিতে হবেই। কোথাও ঝরনা, কোথাও বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি আর সবুজ বনের অসীমতা। জঙ্গলের ভেতরে প্রায় দশ কিলোমিটারের মতো ট্রেক বা হাঁটার পথ আর জঙ্গল অবধি পৌঁছানোর আগেও কিছু পথ ট্রেক করা যায়। ন্যাশনাল পার্কে যাবার পথে ট্রেক করার কিছু সুবিধা তো আছেই। এই যেমন গ্রামবাসীর সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। আর পথও হাঁটার জন্য বেশ ভালো। ৪/৫ কিলোমিটার খানিক উঁচুনিচু, খানিক পাহাড়ি ঝরনার হাসি, খানিক আঁকাবাঁকা পথ আর খানিক স্থানীয় দু’একজন মানুষের দেখা পাওয়া। জঙ্গল বলে আসলে আলাদা কিছুই চোখে পড়ছে না। 

সমস্তটাই প্রকৃতি মাতা নিজের কোলে টেনে নিয়েছে। কখনো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি, আবার কখনো মেঘ দিয়ে ঢেকে পথ ভুলিয়ে দেয়া। সামনের গ্রামের নাম রোপো। রোপো গ্রামের পুরুষরা এতক্ষণে চলে গিয়েছে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, পশু চড়াতে বা কৃষিকাজে। নারীরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত। শুধু সময় আছে এ গ্রামের বৃদ্ধদের। পথচারী পেলেই ধরে ধরে গল্প শোনাচ্ছেন। আমার সঙ্গে যে বুজুর্গ ব্যক্তির মোলাকাত হলো তার নাম চরণ ঠাকুর। বয়স আশির কাছাকাছি। দাঁত একটিও নেই। কিন্তু মনে আনন্দ অনেক, নিস্কলুষ আনন্দ। নির্ভার, অকপট জীবনযাপন দেখতে হলে পাহাড়ের জুড়ি নেই। এ গ্রামের সব বাড়ি একতলা কাঠের, ট্যালির ছাদ। কোনো কোনো বাড়ির দেয়াল পাথর খণ্ড দিয়ে সারি সারি সাজানো। খুব একটা অর্থনৈতিক পার্থক্য নেই এক ঘর থেকে অন্য ঘরের মানুষের মধ্যে। একটিও স্কুল নেই গ্রামে৷ পাশের গ্রামে আছে। আর অসুখ-বিসুখ হলে যেতে হবে মানালি সেই পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। তবুও আনন্দের শেষ নেই এই জনবিরল দেশে। বায়ুদূষন, শব্দদূষণ তো নেই বন্য প্রাণীদের যাতে বিরক্তি না ধরে সেকারণে কেউ হইচই করে না। হালে ইন্টারনেট আসার কারণে একটু সেদিকে ঝুঁকেছে অল্প কিছু তরুণ। এছাড়া এই গ্রাম প্রকৃতির মতোই সরল। 

রোপো গ্রাম থেকে আরও খানিকটা ঝলমলে সবুজ চোখে মাখতে মাখতে আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এসে গেলাম ন্যাশনাল পার্কের গেইটের সামনে। এখানে থাকার জন্য মূল গেইটের কাছে কয়েকটা হোটেল আছে, হোটেল থেকেই ন্যাশনাল পার্ক রূপ খেলিয়ে যাচ্ছে। আজ ঠান্ডাও জাঁকিয়ে পড়েছে। দুপুর হলেও দিনের আলো নিভু নিভু। আজ আর জঙ্গলে ট্রেক না করে সোজা চলে গেলাম হোটেলের বনভূমি লাগোয়া বারান্দায়। এখন থেকে তীর্থন নদীর সরু গলার হার সরাসরি দর্শন দিয়েছে। খুব তার তাড়া এবেলা। কোথায় যেন ছুটছে। নদী আসে পাহাড়ি ঝরনায় হাত ধরে ছুটতে ছুটতে বা বরফ গলা জল সাথে করে। একেক সময় ঝরনার হাত ছুটে যায়। কিছুদূর চলার পর অন্য ঝরনা ঠিকই তার হাত ধরে ফেলে। হাত ধরা আর ছেড়ে চলে যাওয়ার এই রীতিতে একসময় নদী নিজেই অন্য নদীর সঙ্গে মিশে যায়। আমাদের তীর্থন নদী যেমন আরও দূরে গিয়ে মিশেছে বিয়াস নদীর সঙ্গে।  

আশেপাশে পাইন গাছ সারিবেধে দুলছে। নদী, বনভূমি, প্রকৃতির আসলে আলাদা কোনো দেশ হয় না। যে নদী হিমালয়ের বুকজুড়ে থাকে, তাকেই আবার মরুভূমি আপন করে নিতে পারে। যে প্রকৃতি আলাস্কার মানুষকে ঘরছাড়া করে একই প্রকৃতি ভারতবর্ষের পথিকের বুকে কাঁপন ধরায়। আপাতত হোটেলের বারান্দায় বসে কফি খেয়ে কাটানো ছাড়া আর উপায় নেই। কারণ বাইরে এখন বৃষ্টির দাপট বেড়েছে, সাথে ঠান্ডাও। এই গ্রীষ্মকালে এখন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। আর ন্যাশনাল পার্কের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় গিয়ে ফিরে আসতেও দিন পার হয়ে যাবে। 

পরদিন সকালে প্রকৃতি আমায় জানিয়ে দিলো যে- সে আমাকে ভালোবাসে। বাইরে ঝলমলে রোদ, ওকে গাছ মাথা দোলাচ্ছে। দূর থেকে দূরে সারি সারি পাহাড় মেঘ থেকে উঠে মুখ তুলে চাইছে আমার দিকে। সূর্যের বাকা রশ্মি ভেদ করতে চাইছে তাদের হৃদয়। পাহাড়ি এলাকায় এরচেয়ে শুভ সংবাদ আর হয় না। কে বলেছে সংবাদের জন্য টিভি বা খবরের কাগজ পড়তে হয়। এখানে তো সংবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে বাতাসে।

চা নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম অচেনা এক বনভূমির গন্ধ নিতে। এই বনভূমির কয়েকটি  ভাগের মাঝে মূল অংশ হলো- তীর্থন ভ্যালি। আমি তীর্থন ভ্যালি ঘুরে বেড়াব আজ। পাহাড়ি এলাকা, রোদ থাকতে থাকতে যতখানি ঘুরে নেয়া যায়। কোথাও, কোনো দেশেই পাহাড়ের মন বোঝা দায়। এই মেঘ, এই রোদ তো এই ঝরঝর ঝরিয়ে দেবে বৃষ্টি।  

মূল গেইটের সামনে আমি সেই অচেনা সবুজ পাহাড়ের মতো, কানে সূর্যের ছটার মতো দুল পরিহিত সেই নারীর দেখা পেয়েছি। আমার সঙ্গে গাইড নেই। জঙ্গলে গিয়ে ফিরে আসতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। আর একান্তই যদি বিকেলের মধ্যে ফিরতে না পারি তবে ফরেস্ট গার্ডরা আমাকে খুঁজে নেবে। গেইটে নামধাম লিখিয়ে এসেছি। পার্কের গেইট সন্ধ্যায় বন্ধ হবার আগে সবাইকে বেরিয়ে যেতে হয়। ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে রাতে তাবু খাটিয়ে থাকা যায় না। বাইরে থাকা যায়। 

এই বনের ট্রেইল কেমন তা জানা নেই। এক ধার দিয়ে শুরু করলে নিশ্চয়ই কোথাও পৌঁছানো যাবে। আজ যেহেতু রোদ উঠেছে তাই মেঘও নেই পথের চারপাশে। অবশ্য পথ বলতে কোথাও খুব সরু পথের উপর কিছু পাথর বিছানো আছে, কোথাও মাটির খাড়া চড়াই-উতরাই। কোথাও কোনো পথের চিহ্ন নেই; বুক সমান গাছগাছড়া পেরিয়ে সামনে এগুচ্ছি। আমি যে হোটেলে উঠেছি তার মালিক জানিয়েছে, ভাগ্য ভালো থাকলে দু’একটা বন্য পশু যেমন হরিণ বা নেকড়ের দেখা মিলতে পারে। বাঘ ভাল্লুকদের বিচরণভূমিতে আমাদের প্রবেশ নিষেধ। আমি অবশ্য দেড় ঘণ্টা ট্রেইলে অনেক দূরে দুটো বুনো ছাগল ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। আর শুনেছি পাখির ডাক। একেক পাখির একেক ডাক। চড়ুই আর কাঠঠোকরা দেখলেই চিনি। কিন্তু আর কিছু রঙিন পাখি যেমন টেসলা, গ্রসবিক, ফ্লাইকেচার আছে যাদের আগে দেখিনি বা দেখলেও সেভাবে খেয়াল করিনি। এরা কিচিরমিচির করে প্রকৃতির আড়ালে আবডালে বেশ আছে। 

একদিকে পাহাড়, আরেকদিকে পাহাড়ি ঝরনা। খানিক পাহাড় বেয়ে উঠলে মহীরুহকে আর বিশাল বলে মনে হয় না। মনে হয় পাহাড়ের উপর ঘাসের গালিচা। হিমালয়ের একেক জঙ্গলের রূপ একেক। এই জঙ্গল আমার কাছে সাজসজ্জাহীন নিখাঁদ মনে হয়, আড়ম্বর নেই, আছে অকপটতা। রূপ মাধুরি ঠিকরে পড়লেও মনে হয় পাহাড়ি কায়দায় তা নীরব আর সরল। আমি একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখি খানিক দূরেই তীর্থন নদী আছড়ে পড়ছে পাহাড়ি বড় বড় পাথরের গায়ে। 

সেদিকটায় যাবার পথ খুব সম্ভবত একটাই, যেটা সোজা নিচে চলে গিয়েছে। অবশ্য পথ ভুল হলে ঘুরতে হবে। ঝোপজঙ্গলে জায়গায় জায়গায় ফুল ফুটেছে। ফুল দেখতে গিয়ে পা পিছলে পড়তে পড়তে আরও খানিক নিচে নেমে গেলাম। অবশেষে একেবারে অচেনা যে নদীর কাছে আসতে চেয়েছিলাম তার মুখোমুখি আমি, মূল তীর্থন নদী। এখন রাগে ফুসছে। উত্তালতায় আছড়ে পড়ছে ভীষণ শব্দ করে। জলে হাত দিলেও রাগ কমে না। বরফের মতো ঠান্ডা সে জল। হয়তো নদীর সব রাগই অবশিষ্ট ছিল আমাকে দেখানোর জন্য। আমি বসে পড়লাম এক কোণায়। সামনে নদী বইছে, নদীর ওপাশে পাহাড় নিশ্চুপ। পাহাড়ের সব কথা নদী বলে যাচ্ছে। সবুজ সবুজে আর তার উপর রুপালি কারুকাজ করছে নদী। হিমালয়ের অবাধ বিচরণভূমির এই বন প্রতিদিনই অদেখা, অজানা ইতিহাস লিখে রাখে গাছের পাতায় পাতায়, শিশিরের চোখের কোনে, হিমালয় ছেড়ে কোথাও না যেতে চাওয়া পাখির ডানায়। অদৃশ্য সেই লিপি, চঞ্চল সেই ভাষা।

পাহাড় সবুজের ঢেউ খেলায়, হিম বাতাস বয়। আর সত্যি সত্যিই জনবিরল, অজানা এই নদী কাউকে হাতছানি দিয়ে না ডাকলেও আমার আসতে একটুও বাধা নেই।