কৃষি

দিল্লি বহুত দুরস্ত!

হাবিবুর রহমান স্বপন : বৈচিত্রে ভরপুর ভারত। বহু ভাষাভাষি, জাতিগোষ্ঠি, ধর্ম ও বর্ণের দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লি। প্রায় তিন হাজার বছর বয়স হবে দিল্লি নগরীর। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে থেকে ৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মহাভারতের পা-বরা রাজত্ব করেছেন আরাবল্লী অঞ্চলের পুরাতন দিল্লির নিকটবর্তী যমুনা নদী তীরের এই এলাকায়। তখন এই এলাকার নাম ছিল ইন্দ্রপ্রস্থ। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগের জনপদ এই ইন্দ্রপ্রস্থ।মহাভারতে পা-বদের সঙ্গে কৌরবদের যুদ্ধ হয়েছিল দিল্লির চতুর্দিকের বিস্তীর্ন এলাকার মালিকানা নিয়ে। পা-বরা তাদের উত্তরাধিকারের অংশ দাবি করেছিল কৌরবদের কাছ থেকে। যে পাঁচটি এলাকা তারা দাবি করেছিল সেগুলো হচ্ছে, পানিপাত, সোনিপাত, ইন্দ্রপাত, বাগপাত ও তিলপাত। দাবি না মানায় যুদ্ধ হয়। যেখানে যুদ্ধ হয় সে স্থানটির নাম কুরুক্ষেত্র। দিল্লি থেকে ৯০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। পা-বদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যুদ্ধে তাদের জয় হয়। তিলপাত ও সোনিপাত দিল্লি শহরের মধ্যে অবস্থিত। এই তিলপাত এবং সোনিপাতকে ঘিরেই দিল্লি শহর গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময় দিল্লির নাম পরিবর্তন হয়েছে। যেমন : হস্তিনাপুর, দিল্লীকা, কিলা রাই পিথোরা, লাল কোট ইত্যাদি। দ্বিতীয় শতকে মৌর্য রাজারা দিল্লিকে গড়ে তোলেন। কিংবদন্তীর রাজা দিল্লু’র নামানুসারে নাম করণ হয় দিল্লির। তখনই আর্য সভ্যতার প্রসার ঘটে দিল্লিতে। দিল্লীকা গ্রামে টোমর রাজপুত দলপতি অনঙ্গপাল ‘লাল কোট’ নামে প্রথম নগরী গড়ে রাজধানীর পত্তন করেন। টোমরদের হাত থেকে ১২ শতকে রাজপুতদের দখলে যায়। এই বংশেরই শেষ (১১৫৩-’৬৪ খ্রি.) শাসক পৃথ্বিরাজ কুতুব মিনারের পাশে প্রাচীরে ঘেরা দ্বিতীয় নগরী ‘কিলা রায় পিথোরা’ গড়ে তোলেন। ১১৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৯১ পর্যন্ত এর আয়তন বাড়ে এবং তখন ‘লালকোট’ নামকরণ করা হয়। এসময়ই আফগান সেনাপতি মোহাম্মদ ঘোরী দিল্লি আক্রমণ করেন। প্রথমবার পরাজিত হলেও পরবর্তী বছরই ঘোরী পৃথ্বিরাজকে পরাজিত করে ভারতে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। কথিত আছে পৃথ্বিরাজ স্বয়ম্ভর সভা থেকে কনৌজ এর রাজা জয়চাঁদ-এর কন্যা সংযুক্তাকে অপহরণ করেন। এতে জয়চাঁদ ক্ষুব্ধ হন এবং ঘোরীকে সমর্থন দেন। ১১৯১ খ্রিস্টাব্দে থানেশ্বরের কাছে তরাইন নামক স্থানে উভয়পক্ষের যুদ্ধ হয়। এতে রাজপুত বাহিনীর আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয় ঘোরীর বাহিনী এবং ঘোরী আহত হয়ে গজনীতে ফেরত যান। পরবর্তী বছর ঘোরী বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে পুনরায় আক্রমণ করেন। যুদ্ধে পৃথ্বিরাজ বাহিনী পরাজিত হয় এবং তিনি নিহত হন। ঘোরী তার বিশ্বস্ত অনুচর কুতুবউদ্দিনকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্বদেশে ফিরে যান। কুতুব উদ্দিন দিল্লিতেই রাজধানী রাখলেন। যুদ্ধ জয়ের স্মৃতি ফলক নির্মাণ করেন কুতুব উদ্দিন ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে। ২শ ৮৩ ফুট উঁচু মিনারটির নামকরণ করা হয় ‘কুতুব মিনার’। কুতুব উদ্দিনের জামাতা ইলতুৎমিশ (১২১১-১২২৭ খ্রি.) দিল্লির কলেবর বৃদ্ধি করেন। মোহাম্মদ ঘোরীর দিল্লি জয়ের পর ‘নগর বিপ্লবের’ সূচনা হয়। ইলতুৎমিশ-এর সময় থেকে তা আরও সম্প্রসারিত হতে থাকে। তার সময়েই রৌপ্য মূদ্রা ‘তংকা’ ও তাম্র মূদ্রা ‘জিতাল’ প্রচলিত হয়। রাজপুতদের সময় নগর ছিল জাতি প্রভাবিত। নাগরিক জীবনের সুখ-সুবিধার ক্ষেত্রে ইলতুৎমিশ সরকার জাতিগত ও বর্ণগত বৈষম্যের অবসান ঘটান। ফলে মজুর, শিল্পী, অজাত প্রভৃতি নির্যাতিত শ্রেণি স্বেচ্ছায় নতুন তুর্কি সরকারের সেবায় নিযুক্ত হয়ে নতুন শহর ও নগর গঠনের কাজে সংশ্লিষ্ট হয়। ইলতুৎমিশ অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করলেও প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ক্রীতদাস। জলালউদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কুতুবউদ্দিন তাকে ক্রয় করেন। ইলতুৎমিশ সাহিত্য, ধনুর্বিদ্যা ও সামরিক বিদ্যা লাভ করেন। কুতুবউদ্দিন তার কন্যর সঙ্গে ইলতুৎমিশের বিয়ে দেন। কুতুব উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার অপর পোষ্যপুত্র আরাম শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন অযোগ্য। তাই দিল্লির আমীর ওমরাহরা ইলতুৎমিশকে শাসনভার গ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। তখন তিনি বদাউন প্রদেশের শাসক। ইলতুৎমিশ দিল্লি আক্রমণ করে আরামশাহকে উৎখাত করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন।ইলতুৎমিশের সময়ই ১২২১ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খাঁ ভারত আক্রমণ করে। চেঙ্গিজ বাহিনী পশ্চিম পাঞ্জাব ও সিন্ধু পর্যন্ত দখল করে ব্যাপক লুটতরাজ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। ইলতুৎমিশ এ সময় চেঙ্গিজ খাঁনের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। এতে চেঙ্গিজ খাঁন সন্তুষ্ট হয়ে দিল্লি আক্রমণ না করে ফিরে যান। এমন কত কাহিনী দিল্লিকে ঘিরে। এ কারণেই ঐতিহাসিক এই দিল্লিকে বলা হয় নগরের নগরী বা নগর সমূহের রাজধানী। এখন দিল্লি শুধু ভারতের রাজধানী। সুলতানী এবং মোগল আমলে দিল্লি ছিল অবিভক্ত ভারতের রাজধানী। অর্থাৎ পশ্চিমে আফগানিস্তানের গজনী থেকে বর্তমান পাকিস্তান ও সমরখন্দ এবং পূর্ব দিকের বাংলাদেশ ও মায়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল দিল্লির সাম্রাজ্য।  দিল্লির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত করেন আলাউদ্দিন খিলজি (১২৯০-১৩১৬খ্রি.)। তিনি দূর্গনগরী ‘সিরি’ গড়েন ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে। যেটি এখন হজখাস নামে পরিচিত (হজ-ই-আলাই)। তুরস্কের ঘোর থেকে আসা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে মিশেলে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে স্বঘোষিত সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক তৃতীয় নগরী গড়েন ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে আদিলাবাদে। গিয়াস উদ্দিনের পুত্র মহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি.) ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে কুতুব মিনারের কাছে গড়েন চতুর্থ নগরী জাহানপানা। যা উত্তরের ‘সিরি’ থেকে দক্ষিণের ‘কিলা রায় পিথোরা’ পর্যন্ত বিস্তৃত। মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লি থেকে ১১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর করেন। তার আদেশে দিল্লির অধিবাসীদের দেবগিরিতে যেতে বাধ্য করা হয়। দিল্লিবাসী তাদের গৃহপালিত গবাদি পশুসহ সকল কিছু নিয়ে নতুন রাজধানীতে যেতে বাধ্য হন। নতুন রাজধানীর নামকরণ করা হয় দৌলতাবাদ। কিন্তু সেখানে নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে তীব্র গরম ও পানির সংকট। জনমনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত দাক্ষিণাত্যে দিল্লির মুসলমানরা থাকতে অস্বস্তিবোধ করে। এ ছাড়া তারা তাদের সকল সম্পদ বিশেষ করে বাড়ি-ঘর, গাছ-পালা ইত্যাদি রেখে যাওয়ায় তারা ছিল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। রাজধানী পুনরায় দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। দিল্লি ফেরার পথে তৃষ্ণা এবং গরমে প্রচুর লোক মারা যায়। এ কারণেই এখনও এধরণের অপরিনামদর্শী কোন আদেশ-নির্দেশ বা কাজ করা হলে ভারতীয়রা বলে থাকে তুঘলকি কাণ্ড। এর পর ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮ খ্রি.) গড়েন পঞ্চম নগরী ফিরোজাবাদ। যেটি এখনকার পুরানো কেল্লা। তুঘলকদের সময়ই সমরখন্দের তৈমুর লং ঝটিকা দিল্লি আক্রমণ করে তুঘলক বংশের শেষ নরপতি সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদকে পরাজিত করেন। সুলতান নাসির উদ্দিন গুজরাটে পালিয়ে যান। তৈমুরের বাহিনী দিল্লিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট করে। লাখ লাখ নাগরিককে হত্যা করে। দিল্লি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তৈমুর লং লুটে নেয় বহু মূল্যবান সম্পদ। এর পর নসরত শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং ১৪০১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নাসির উদ্দিন ফিরে এসে ক্ষমতা দখল করে ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। এর পর দিল্লির মসনদে ক্ষমতাসীন হন দৌলত খাঁ। তাকে পরাজিত করে তৈমুরের প্রিয়পাত্র খিজির খাঁ (১৪১৪-১৪২১ খ্রি.) ক্ষমতা দখল করেন। খিজির খাঁ ছিলেন মুলতানের শাসক। তিনিই সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। হযরত মোহাম্মদ (স:)-এর বংশধর ছিলেন বলেই তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশকে সৈয়দ বংশ বলা হয়। ১৪১৪ থেকে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সৈয়দরা দিল্লির মসনদে ক্ষমতাসীন থাকেন।  সৈয়দ বংশের শেষ শাসক আলাউদ্দিন আলম শাহ ছিলেন অযোগ্য শাসক। ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে বহুলুল লোদী দিল্লি আক্রমণ করলে আলাউদ্দিন আলম শাহ সিংহাসন ত্যাগ করে বদাউন চলে যান। বহুলুল লোদী ক্ষমতায় থাকেন ১৪৫১ থেকে ১৪৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এর পর তার তৃতীয় পুত্র সিকান্দার লোদী দিল্লির সিংহাসনে ছিলেন ১৪৮৯ থেকে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেন এবং নিজ নামে সিকান্দ্রা দূর্গ গড়েন। সিকান্দার লোদীর মৃত্যুর পর তার পুত্র ইব্রাহিম লোদী ক্ষমতাসীন হন। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে বাবর (১৫২৭-১৫৩০খ্রি.) ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত ও হত্যা করে মোগল সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। অবসান হয় প্রায় তিন শ বছরের সুলতানি শাসনের। বাবর আগ্রা জয় করেন এবং দিল্লি থেকে রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তর করেন। বাবরের পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে। ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাজধানী গড়েন ফিরোজাবাদের দক্ষিণে দিনপানাহ নামে। আরও পরে হুমায়ুনের পরাজয়ের ফলে সাময়িকভাবে আফগান নায়ক শের শাহ সুরীর দখলে যায় দিল্লির সিংহাসন। দিল্লি গেট এবং দিনপানাহ বা পুরানা কেল্লার নিকট শের শাহ সুরী গড়েন ৬ষ্ঠ নগরী শেরগড়। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন শক্তি সঞ্চয় করে কাবুল থেকে ফিরে পুনরায় দিল্লির দখল নেন। গড়ে তোলেন ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ প্রাচীরে ঘেরা ৭ম নগরী শাহজানাবাদ অর্থাৎ এখনকার লালকেল্লা। প্রাচীর প্রায় বিলুপ্ত হলেও ১৪টি গেটের ৫টি এখনও অতীত রোমন্থন করায়। গেট সমূহের নাম : দিল্লি গেট, কাশ্মীরি গেট, আজমেরি গেট, তুর্কমেন গেট, লাহোরী গেট ইত্যাদি।  

দিল্লীর আধুনিক স্থাপত্য বাহাই মন্দির বা লোটাস টেম্পল আপনাকে মুগ্ধ করবে। কনট সার্কাস থেকে বাসে যাতায়াত করা সহজ। বিশ্বের কনিষ্ঠতম ধর্ম বাহাই। প্রবর্তক বাহাউল্লাহ (১৮১৭-’৯২ খ্রি.)। ভারতে আগমন ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। কনট সার্কাস থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে কালকাজির বাহাপুরে অবস্থিত মন্দিরটি। বিশাল পুষ্প বাগিচার মধ্যে ৯টি জলাশয়ের মাঝে ৯টি স্বর্গীয় পথ চলে শ্বেতমর্মরে ৩০ দশমিক ৫ মিটার উঁচু আধা ফোটা কমল যেন বাহাই মন্দির। এখানে ১৩ শ ভক্তের জন্য প্রার্থনার বা বসার ব্যবস্থা আছে। দ্বার সবার জন্য অবারিত। সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।   ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনটি ইন্ডিয়া গেটের বিপরীতে রায়সিনা পাহাড়তলিতে অবস্থিত। ৩ শ’৩০ একর জমির উপর ৩ শ’৪০ টি ঘর, ৩৫ টি লবির ভবনটি চার তলা বিশিষ্ট। কৃত্তিম পাহাড়, বাগিচা, ঝরনা, জলাশয় এবং প্রচুর বৃক্ষরাজিতে ভরা চত্বর। এটি নির্মিত হয়েছে ১৯২১-’২৯ খ্রিস্টাব্দে। তখন ছিল এটি লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর বাসভবন। এই ভবনটিতে মহাত্মা গান্ধী হাসপাতাল বানাতে চেয়েছিলেন। রংবেরংয়ের পাথরের নক্সায় এই ভবনে রয়েছে ২৩ মিটার ব্যাসের দরবার হল যার নাম অশোক হল। সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। বিদেশীরা ভারতীয় পর্যটন কর্পোরেশনের অনুমতি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের বাগানটি দেখতে পারে। মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ এক মাস সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকে। সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দরজা উন্মুক্ত থাকে। রাষ্ট্রপতি ভবনের উত্তর পূর্বদিকে রাজপথের লাগোয়া সংসদ মার্গে (পার্লামেন্ট স্ট্রিট) সংসদ ভবন। গোলাকৃতির ভবনটি ১৭১ মিটার ব্যাসের। এখানে ভারতীয় পার্লামেন্ট অর্থাৎ রাজ্য আ্যসেম্বেলির নির্বাচিত ২৫০ জন (২ বছর অন্তর এক তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন) কাউন্সিল অব স্টেটস বা রাজ্যসভা ও জনগণের ভোটে ৫ বছর অন্তর নির্বাচিত ৫৫৩ সদস্যের লোকসভা বসে। ৪ টি ডমিনিয়ন কলামস্ স্থাপিত হয়েছে ভবনটিতে। এই চারটি কলামস্ বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ দান করেছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড। এগুলো ভবনটির শ্রীবৃদ্ধি করেছে। রাজঘাটে ভারতের জাতীয় স্মৃতি সৌধ। জনপথ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ফিরোজ শাহ কোটলার উত্তর পূর্বে দিল্লী গেটের সন্নিকটে রিং রোডে যমুনা তীরে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি সৌধ। দেশ-বিদেশের প্রচুর লোক আসে এখানে প্রতিদিন মহান এই নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে। পাশেই রয়েছে গান্ধী সংগ্রহশালা। শান্তিবন রাজঘাটের সঙ্গেই লাগোয়া। এখানেই আছে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী পুত্র ১৯৮০-তে বিমান দূর্ঘটনায় নিহত সঞ্জয় গান্ধীর স্মৃতিবেদি। আর একটু এগিয়ে বিজয়ঘাটে ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদূর শাস্ত্রীর সমাধীবেদি। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার তাসখন্দে (ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করার পর)। রাজঘাট ও শান্তিবনের মাঝখানে শক্তিস্থলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্মৃতি মন্দির। তিনি ১৮৮৪-এর ৩১ অক্টোবর নিজ বাসভবনে তার দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। মায়ের কাছেই তৈরি হয়েছে ইন্দিরা তনয় ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর স্মৃতি স্তম্ভ। চেন্নাই থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে শ্রীপেরামবুদুরে ১৯৯১-এর ২১ মে রাত ১০টা বিশ মিনিটে ঘাতকের বোমার আঘাতে তিনি নিহত হন। পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে পাঁচটি স্মৃতি মন্দির। কাছাকাছি অবস্থানেই রয়েছে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চরণ সিং ও জগজীবন রামের স্মরণে সমাধি। কনট প্লেস (ইন্দিরা চক) থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে কুতুবের পথে অরবিন্দ মার্গে সফদরজং টুম্ব। অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা পিতা মুকিম আবুল মনসুর খানের সমাধিতে (১৭৫৩-১৭৭৪খি.) হুমায়ুনের সমাধির আদলে সমাধি গড়েন। চারপাশে চারটি মর্মর পাথরে নির্মিত মিনার। এর পাশেই দিল্লী ফ্লাইং ক্লাব সফদর জং এয়ারপোর্ট। এই ছোট্ট এয়ারপোর্টেই ইন্দিরা গান্ধী পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বিমান দূর্ঘটনায় নিহত হন। এই চত্বরেই ১৩৩৮-এর ১২ ডিসেম্বর তৈমুর লঙ্গ বাহিনীর কাছে পরাজিত হন মোহাম্মদ শাহ তুঘলক।   পুরানো কেল্লা থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে মথুরা রোডে সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুনের সমাধি। তার মৃত্যুর ৯ বছর পর ১৫৬৪-৭৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের মা হাজী বেগম ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৩ মিটার উঁচু অষ্টকোণী সুদৃশ্য সৌধটি গড়েন। সমাধির উপরে ৩৮ টি পিঁয়াজ সাদৃশ্য গম্বুজ রয়েছে। খিলান এবং জাফরির কাজ অপূর্ব। পাশেই হাজি বেগমের সমাধি। এর পাশেই দারাশিকো, মুরাদ ও সুজার সমাধি। তাদের পুত্র ও নাতিদের সমাধিও এখানে। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদূর শাহও শায়িত আছেন এখানে। মদিনা মসজিদের আদলে পাথরের তৈরি মসজিদ রয়েছে এই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্ব হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অদূরে নিজাম-উদ-দিন রেল স্টেশন। দিল্লীতে আরও দেখার আছে যন্তর মন্তর, প্রাচীন কালী বাড়ি, গুরুদ্বারা বালা সাহিব, দমদমা সাহিব গুরুদ্বারা, বাংলা সাহিব গুরুদ্বারা, দিগম্বর জৈন মন্দির, ১৩৮০ খ্রি. ফিরোজ শাহ তুঘরকের সময়ের খিরকী মসজিদ, শহরের তিশ জানুয়ারি মার্গে গান্ধী বলিদান স্থল (যে স্থানে ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে নথুরাম গড্সে গুলি করেছিল) ‘গান্ধী স্মারক’।দিল্লীতে প্রায় সকল এলাকায় রয়েছে নানা প্রকার বা নানা মানের খাবার হোটেল। বাঙালি, পাঞ্জাবী, মারাঠি, উড়িয়া, গুজরাটি, বিহারি ইত্যাদি সকল জাতি-গোষ্ঠীর খাবার মেলে দিল্লীর বিভিন্ন বাজারের হোটেলে। নিউ দিল্লী রেল স্টেশন এবং পুরানো দিল্লী স্টেশনের সামনে বেশ কয়েকটি বাঙালি হোটেল আছে। নিউ দিল্লী স্টেশনের বিপরীতে রয়েছে লোকনাথ হোটেল, কাছাকছি দূরত্বে আছে বাঙালি হোটেল। রসগোল্লা বা ছানার মিষ্টি পাওয়া যায় দিল্লীর বেশ কয়েকটি এলাকায়। তবে স্টেশন এলাকায় বেশ কযেকটি দোকান আছে। দক্ষিণ ভারতীয় খাবার যেমন দোসা, ইডলির স্বাদ নিতে ভুলবেন না। শাহী বিরানী, মোগলাই পরাটা, গোলগাপ্পা, আলুটিকিয়া, লিটটি, যবের ছাতু, ছোলার ছাতু, কচুরি, চানা-বাটোরা, চানা, মুগ ডালের পরাটায় রসনা তৃপ্তি করতে পারেন। দিল্লীর ফুটপথের খাবার সমূহ বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। গরম গরম রুটি-পরেটা-চাওমিন এবং সব্জি পাবেন খুবই কম দামে। ডিম-পাউরুটির টোস্টও খেতে পারেন। সর্বত্রই এটি মেলে। বাঙালিরা যেভাবে ছানার তৈরি মিষ্টি পছন্দ করে তেমনটি কিন্তু ভারতের অন্য এলাকার লোকেরা করে না। ভেজিটেবল সুইট বেশীরভাগ ভারতীয় পছন্দ করে। এছাড়াও নিরামিশ ভোজীর সংখ্যাও বেশি। পুরাতন দিল্লীর জুম্মা মসজিদ সংলগ্ন মুসলিম হোটেলে পাওয়া যায় নানা পদের খাসি ও গরুর মাংস। এখানে পাবেন নানা প্রকার চপ ও কাবাব। পাবেন মোগলাই পরেটা এবং শাহী বিরানী ও পোলাও। মুরগীর মাংশও মেলে। তবে মাছ পেতে হলে আপনাকে নিউ দিল্লী স্টেশন অথবা পুরাতন দিল্লীর নির্দিষ্ট কয়েকটি হোটেলে যেতে হবে। তবে কিছু বনেদি হোটেলে ‘মাছলি’ (মাছকে মাছলি বলা হয়) পাওয়া যায়। মেগা সিটি দিল্লীতে বসবাস করে সকল ধর্মের মানুষ এবং তিন শতাধিক ভাষা-ভাষি। অতএব নানা প্রকার খাদ্যের সমাহার ফুটপথের মোড়ে মোড়ে। খাবার পর দিল্লীর প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ টক দই খেতে পছন্দ করে। চাঁদনি চকের মিষ্টির দোকানের দিল্লীর লাড্ডুর স্বাদ নিতে ভুলবেন না। না খেলে পস্তাতে হবে। অবশ্য খাওয়ার পরও পস্তাতে হতে পারে।যেহেতু দিল্লী প্রাচীন শহর তাই সেটি কুটির শিল্পীদের তীর্থস্থান এটি বলা অত্যুক্তি হবে না। হাতে তৈরি বা বুনন শাড়ি, চাঁদর, জুতো, কার্পেট, সালোয়ার, কমিজ ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। সারা ভারতের পণ্য দিল্লীর দোকানপাটে পাবেন। ফুটপথের দোকান গুলোতেও ভীড় লক্ষ্য করার মতো। কনট প্লেসে সরকারি বিক্রয় কেন্দ্র যার নাম গভর্নমেন্ট সেলস এম্পোরিয়াম, পাশেই পালিকা বাজার, অদূরে জনপথে সেন্ট্রাল কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং অসংখ্য দোকান। কাছাকাছি দূরত্বে তিব্বতীয় মার্কেটে কম দামে হস্ত নির্মিত পোশাক পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পণ্য পাবেন বাবা খড়ক সিং মার্গের এম্পোরিয়ামে। কেনা-কাটার জন্য সবচেয়ে ভাল বাজার হচ্ছে প্রগতি ময়দানের বিভিন্ন রাজ্যের প্রদর্শণী ও বিক্রয় কেন্দ্রে। দাম বেশি মনে হবে, তবে এটা নিশ্চিত হতে পারবেন পণ্যগুলো আসল। দিল্লী ট্যুরিজমের হ্যান্ডিক্রাফট মার্কেটে কম দামে সুন্দর পণ্য পাওয়া যায়। তবে দাম-দর করে নিতে হয়। নিউ দিল্লী স্টেশনের কাছে পাহাড়গঞ্জ বাজারে সবই পাওয়া যায়। এখানেও দর-দাম করে পছন্দের পণ্যটি বেছে নিতে হবে। জুম্মা মসজিদের চতুর্দিকের দোকানে পাবেন মুসলিমদের সকল প্রকার পোশাক এবং অন্যান্য পণ্য। এখানকার মিনা বাজার প্রসিদ্ধ। নতুন ও পুরাতন বই কিনতে হলে যেতে হবে দরিয়াগঞ্জের নঈ সড়কে। করোল বাগের আজমল খাঁ মার্কেটের পণ্যের সমাহার আপনাকে আকৃষ্ট করবে। অ্যান্টিক কিছু কিনতে যেতে হবে ড. জাকির হোসেন রোডের সুন্দরনগর মার্কেটে। লাল কেল্লার পিছনের চোরি বাজার পর্যটকদের প্রিয়। কনট সার্কাস, সদর বাজার, চাঁদনি রবিবার বন্ধ থাকে। সোমবার বন্ধ থাকে পাহাড়গঞ্জ, গান্ধী মার্কেট, সবজি মা-ি, করোলবাগ, শুক্রবার বন্ধ থাকে করমপুরা, মতিনগর মার্কেট, বুধবার তিলকনগর। দিল্লীর বিভিন্ন বাজারে পাথর এবং ইমিটেশনের গহনা পাওয়া যায়। দিল্লীর বাজারে কাশ্মীরের পণ্য যেমন শাল, সোয়েটার, কার্পেট, বেলোয়ারি কাঁচের চুরির কদর বেশি। বিদেশীরা বিশেষ করে বাংলাদেশীরা শাল, সোয়েটারই বেশি কেনে। আমি জুম্মা মসজিদের সামনে এক পাথর বিক্রেতার কাছে থেকে ১২ টি পাথর (আংটি এবং কানের রিং-এর জন্য ব্যবহৃত) কিনেছিলাম মাত্র ৫০ রুপীতে। দোকানী দাম হেঁকেছিল ৫শ টাকা। দিল্লীতে মঙ্গলবার কোন সেলুন খোলা পাবেন না।

দিল্লী শহরে বাস এবং মেট্ট্রো ট্রেনে সস্তায় যাতায়াত করা যায়। মোট ১৯০ কিলোমিটার মেট্রো লাইন এবং স্টেশন ১৪২টি, যার ৩৫ টি ভূগর্ভে। বিশ্বের ১৩ তম মেট্রো নেটওয়ার্ক এটি। দিল্লীতে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার বাস রয়েছে যা টাউন সার্ভিসে নিয়োজিত। এছাড়াও আছে পর্যাপ্ত ট্যক্সি ও অটো রিক্সা। কিছু মানুষে টানা রিক্সা পুরাতন দিল্লীতে এখনও দেখা যায়।রাজধানী এখন নতুন দিল্লীতে। এখানেই ছিল বৃটিশদের রাজধানী। ব্রিটিশদের সময় যে সব রাজা-রাণী ও তাত্ত্বিকদের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল সেগুলো অপসারণ করে সেসব স্থানে ভারতের মহান ব্যক্তিদের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। যেমন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সরদার প্যাটেল, লাল বাহাদূর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী প্রমূখ। সড়ক ও পথের নাম পরিবর্তন হয়েছে। কুইন ভিক্টোরিয়া রোড হয়েছে রাজেন্দ্র প্রসাদ রোড, কার্জন রোডের নামকরণ করা হয়েছে কস্তুরবা গান্ধী মার্গ, ক্লাইভ রোড হয়েছে ত্যাগরাজ মার্গ। কনট প্লেস হয়েছে ইন্দিরা চক, কনট সার্কাস হয়েছে রাজীব চক ইত্যাদি। নতুন দিল্লীর কনট সার্কাস বা ইন্দিরা চক হচ্ছে দিল্লীর প্রাণ কেন্দ্র। ইন্দিরা চক থেকে ৯ টি পথ চলে গেছে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ঈশান, অগ্নি, বায়ু, নৈঋত ও অধঃ। অধঃ বলতে পাতাল রেল। উত্তরে প্লাজা সিনেমা দক্ষিণে রিগ্যাল সিনেমা। বাস ও মিনিবাস চলছে এই দুই সিনেমা হল ছুঁয়ে নতুন ও পুরাতন দিল্লীর বিভিন্ন দিকে। লালকেল্লার পশ্চিমে পুরানো দিল্লীর (দিল্লী জং) ও শহরের প্রাণকেন্দ্রে পাহড়গঞ্জের পূবে নতুন দিল্লীর (নিউ দিল্লী জং) সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহর বা প্রান্তের রেল সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। দুই স্টেশনের দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। মাঝখানে সদর বাজার স্টেশন। দিল্লীতে ট্যাক্সি চালকরা সুযোগ বুঝে পর্যটকদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করে। এছাড়া দালালের উৎপাত তো আছেই। অতএব একটু সাবধানে চলতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিতে পারবেন। দিল্লীর ঐতিহাসিক স্থান সমূহ যখন পরিদর্শন করবেন তখন ভাল গাইড নিলে অনেক কিছু জানতে পারবেন। আমরা একবার গাইড হিসেবে পেয়েছিলাম উর্দু ভাষী আমজাদ আলী খানকে। তার মতে, আকবর ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ। শাহজাহান ছিলেন, খুনি, বিলাসী এবং অপব্যয়কারি। ঔরঙ্গজেব ছিলেন, নিষ্ঠুর ভাতৃহন্তক তবে ধার্মিক। এভাবেই তিনি যখন ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন তখন তিনি দিল্লীর মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন। সম্রাটদের ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি বিষয় সমূহ বলছিলেন। তাদের দোষ-গুণ সবই বলেন। তার মন্তব্য : মোগলরা সিংহাসন নিয়ে দলবাজি করেছে। নিজেরা হানাহানি করেছে। তারা ছিল অত্যধিক বিলাসী, অত্যাচারি, অপব্যয়কারি, চরিত্রহীন-লম্পট এবং স্বৈরাচারী। এসব কারণেই তাদের করুণভাবে পতন হয়েছে। আবার একজন বাঙালি গাইড যার নাম উমাচরণ রায় তিনি আমাদের বলছিলেন, এটা তো হিন্দুদের রাষ্ট্র। মুসলমান সুলতানরা দখল করেছিল গায়ের জোরে। সুলতান মাহমুদ লুট ও ধ্বংশ করেছিলেন সোমনাথ মন্দির, থানেশ্বর মন্দিরসহ হাজার হাজার মন্দির। তার দৃষ্টিতে হিন্দুদের রাজ্য দখল করে আবার হিন্দুদের কাছ থেকেই মুসলিম শাসকরা জিজিয়া কর নিয়েছে। সেটা ছিল অন্যায় বা জুলুম। তবে এটা সকল গাইডই স্বীকার করে যে, ভারতের মুসলিম ঐতিহ্যগুলো দেখতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে লাখ লাখ পর্যটক আসে। এই খাতে যে আয় হয় তা ভারতের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে। এ প্রসঙ্গে জানা গেল, শুধুমাত্র তাজমহল দেখতেই প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রায় ৮ লাখ পর্যটক আসে। প্রসঙ্গক্রমে গাইডরা একথাটিও শুনালো তাজমহলসহ যা কিছু করা হয়েছে সবই তো এদেশের জনগণের সম্পদ দিয়েই। চেঙ্গিজ খাঁ, তৈমুর লং ও নাদির শাহ সম্পর্কে বলতে গিয়ে গাইডদের মন্তব্য আরও উল্লেখযোগ্য। তারা ছিল লুটেরা। আমরা বাংলাদেশী মুসলিম এই পরিচয় পাওয়ার পর গাইড আমজাদ আলী বললেন, একদা যেভাবে শক্তিধররা লুটপাট করে সম্পদ করতো। এক দেশ আরেক দেশ দখল করে জেঁকে বসে লুটে নিয়ে যেতো মহামূল্যবান সম্পদ। যেভাবে ময়ুর সিংহাসন, কোহিনূর মণি লুট করে দিয়ে গেছে। এছাড়া ইংরেজরাও ভারতের সম্পদ লুটে নিয়ে গেছে। এখনও তার ধারাবাহিকতা চলছে। এখন চলছে খনিজ সম্পদ ও তরল সোনা বা তেল লুটের কারবার। শক্তিধর দেশগুলো কখনও একক ক্ষমতা বলে আবার কখনও ঐক্য জোটে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ দেশ সমূহ দখলে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছে। মোড়লীপনা তখনও ছিল এখনও আছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সেকালেও ছিল এখনও আছে। তখনও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। আমরা সভ্য হচ্ছি ? নাকি আদিম যুগের মানুষের চেয়েও অসভ্য? মানুষে মানুষে হানাহানি বন্ধ হলেই কেবল পৃথিবী শান্তির আবাসস্থল হবে। অন্যথায় মানবতা বিপন্ন হতেই থাকবে। শান্তি হবে সুদূর পরাহত।লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

রাইজিংবিডি/পাবনা/১৮ মে,২০১৪/স্বপন/সন্তোষ  hrahman.swapon@gmail.comমোবা: ১৭১০৮৬৪৭৩৩