‘‘অমরত্ব... এটা তারা অর্জন করেছে...’’ ইন্টার মিলানকে হারিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জেতার পর ম্যানচেস্টার সিটিকে নিয়ে এমন মন্তব্যই করেছেন নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি রিও ফার্ডিনান্ড।
ইউরোপের সবচেয়ে জমজমাট ফুটবল প্রতিযোগিতা ধরা হয় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগকে (ইপিএল)। অর্থের ঝনঝনানি, লড়াই, উত্তেজনা, দর্শক চাহিদা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা; সব মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই সেরার উপমাটা প্রিমিয়ার লিগের দখলে।
ম্যানচেস্টারের হিসেব ধরলে এক ইউনাইটেডকেই ধরা হতো পরাক্রমশালী। রাজত্বটা একসময় যে তাদেরই ছিল। রেড ডেভিলদের পাশাপাশি ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ স্লোগানে সফলতার পথে হেঁটেছিল অ্যানফিল্ডের লিভারপুলও। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগে। ইংলিশ ক্লাবগুলোর মধ্যে তারাই এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ মুকুটধারী।
তবে তাদেরকে চিরকাল দোর্দণ্ডপ্রতাপে একা হাঁটতে হলো না। আসলে হাঁটতে দিলো না ম্যানচেস্টারেরই আরেকটি ক্লাব; ম্যানচেস্টার সিটি। দু’বার নাম বদলের পর ১৪৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ও ষষ্ঠ ইংলিশ ক্লাব হিসেবে ইউরোপ সেরার মুকুট পরলো ম্যানচেস্টারের ক্লাবটি।
এর আগে ইউরোপিয়ান সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল অ্যাস্টন ভিলা, চেলসি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও নটিংহাম ফরেস্ট।
শুধু তাই নয়, ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় ক্লাব হিসেবে একই মৌসুমে জিতলো ত্রিমুকুট তথা ট্রেবলও (প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ)। প্রিমিয়ার লিগের হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বাদটাও পাওয়া হয়ে গেছে।
ম্যানসিটির এই সাফল্যের পেছনে অর্থের ঝনঝনানি আর খেলোয়াড়দের ডেডিকেশনের গল্পটা অনুমেয়। কিন্তু যে ভদ্রলোক ইতিহাদের প্রান্তরে ছড়িয়ে দিলেন জাদুর পরশ, মাথার সুক্ষ্ম খেলা আর দূরদর্শী চিন্তায় আঁকলেন সাফল্যের রূপকথা; সেই মায়েস্ত্রোকে দৃশ্যপটে থাকতেই হবে।
ফার্ডিনান্ড অমরত্বের কথা বললেন বটে, অমরত্বের পেছনে জাদুকরের কথা বলেননি। কারণ, জোসেফ পেপ গার্দিওলা আজীবনই আড়ালের চরিত্র। রহস্যময় আর কেমন যেন পাগলাটে। স্প্যানিশ এই মায়েস্ত্রোর হাত থেকেই একের পর এক ছুটে গেছে তূণ, তীরের ফলায় বিদ্ধ হয়েছে প্রতিপক্ষ। শিরোপা উৎসবে ভেসেছে সিটিজেনরা।
ম্যানসিটির চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার স্বপ্নটা শুরু হয় ২০০৮ সালে। শেখ মনসুরের মালিকানাধীন আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ সিটিজেনদের দখল নেওয়ার পর থেকেই বড় কিছুর পরিকল্পনা করেছিল ক্লাবটি। তবে কাঙ্খিত সাফল্য না আসায় ২০১৬ সালে পেপ গার্দিওলাকে কোচ করে আনে তারা।
গার্দিওলা আসার পরও চ্যাম্পিয়নস লিগের গণ্ডি পার হতে পারছিল না সিটি। সমস্যাটা ধরে আগালেন তিনি। ‘‘টাকাই ঈশ্বর’’ - প্রবাদটা সত্য হলেও খানিক উল্টে দিলেন স্প্যানিশ ভদ্রলোক। টাকাই সাফল্য, এই মন্ত্রকে সামনে রেখে মোটা অংকের টাকায় দলে টানলেন নরওয়েজীয় তারকা আর্লিং হাল্যান্ডকে। বাদ দিলেন জোয়াও ক্যানসেলো, গ্যাব্রিয়েল জেসুস, অলেক্সান্ডার জিনচেনকো এবং রাহিম স্টার্লিংকে।
এরপরই ভোঁজবাজির মতো পাল্টে গেলো সব। প্রতিপক্ষের গোলমুখে হাল্যান্ডকে ফিট করলেন কামানের মতো। মধ্যমাঠ থেকে বলে গিয়ে হল্যান্ডের পায়ে পড়লেই শুরু হয়ে যায় তাণ্ডব। নরওয়েজীয় তারকার গায়ে ‘গোলমেশিন’ তকমাটা সেঁটে যাওয়ার পেছনে কৃতিত্বটাও গার্দিওলার।
সাবেক জার্মান কোচ জোয়াকিম লো'কে ধরা হতো বিশ্বের কোচদের মধ্যে ট্যাকটিক্যালি সেরা। তার মন্ত্রই ছিলো ‘স্পিড উইথ অ্যাটাক’। আর এই কাজটা করার আগে গভীরভাবে ভাবতেন লো। খুব ভোরে সমুদ্রের পাড়ে হাঁটতেন, ছক কষতেন। তাতে সুক্ষ্মদর্শী চিন্তাগুলো আরও পরিষ্কার হতো। ঠিক এই ব্যাপারটাও আয়ত্ত করেছিলেন গার্দিওলা।
ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফের ‘টিকিটাকা’ মন্ত্র ছুঁড়ে পুরোদমে হয়ে উঠলেন গতিতে বিশ্বাসী। যদিও বার্সেলোনায় টিকিটাকায় সাফল্য দেখিয়েছেন গার্দিওলা। তবে স্থান ভেদে নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন চিন্তায় মগ্ন হলেন এবং সাফল্যও পেলেন। এই ব্যাপারটা কেবল গার্দিওলার পক্ষেই সম্ভব।
ঝুঁকি নিতে বেশ ভালোবাসেন গার্দিওলা। ম্যানসিটিতেও এই জিনিসটা চোখে পড়লো। সিটির ট্রেবল জয়ের পেছনে তার বেশ কয়েকটি কৌশল কাজে দিয়েছিল। প্রথম কৌশলটা ছিল জন স্টোনসকে দুই পজিশনে খেলানো। তাতে স্টোনস হয়ে উঠেছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।
ফাইনালেও প্রতিদান দিলেন স্টোনস। শতভাগ ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন সিটির ডিফেন্ডার। ৬টি ড্রিবল করে প্রতিবারই সফল হয়েছেন স্টোনস। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে (জুভেন্টাসের বিপক্ষে) সর্বশেষ শতভাগ ড্রিবল (১০ বার) সম্পন্ন করা খেলোয়াড় ছিলেন লিওনেল মেসি।
সেন্টার-ব্যাক নাথান আকেকেও লেফট-ব্যাক বানিয়েছেন গার্দিওলা আর পুরো ডিফেন্স জুড়ে ম্যানুয়েল অ্যাকাঞ্জি দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন। গার্দিওলার এই ওলটপালট পরিকল্পনা কিংবা হুটহাট ঝুঁকিটা আসলে সাময়িক সময়ের ভাবনা নয়। মূলত প্রতিপক্ষকে চমকে দিতেই তার দীর্ঘ রণ পরিকল্পনা।
গার্দিওলার ব্যাখ্যা ছিল, ‘দুটি কারণে ছয় বা সাত মৌসুমে আপনি একইভাবে খেলতে পারবেন না। প্রথমত, আপনার বাড়তি খেলোয়াড় আছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষ আপনাকে জানে, তারা আপনার গোপন রহস্য ধরে ফেলবে। আর এ কারণেই আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মকভাবে আরেকটি সিস্টেম তৈরি করতে হবে।’
দূরদর্শী চিন্তাধারা, কৌশলগত ভাবনা আর উজ্জীবিত মন্ত্রে দলকে চালিত করা গার্দিওলার কোচিং ক্যারিয়ারেও তাই সাফল্যের লুটোপুটি। কোচিং করিয়েছেন ইউরোপের শীর্ষ তিন দলকে; বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানসিটি।
এই তিনদলের হয়েই হ্যাটট্রিক লিগ শিরোপা জিতেছেন তিনি। যেখানেই কোচিং করিয়েছেন, সেখানেই নিজের দর্শনের ছাপটা রেখেছেন। ক্লাব ফুটবলে তিনটি ভিন্ন লিগের তিন দলকে হ্যাটট্রিক শিরোপা এনে দেওয়া বিশ্বের একমাত্র কোচও গার্দিওলা।
১৫ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে তিন ক্লাবে সব মিলিয়ে ৩৫টি শিরোপা জিতেছেন সাবেক স্প্যানিশ ফুটবলার। ম্যানসিটির হয়ে প্রায় ৭ বছরের ক্যারিয়ারে শিরোপার সংখ্যা ১৪। এর মধ্যে সবশেষ মৌসুমটা হয়ে থাকলো দুর্দান্ত মাইলফলক।
ট্রেবল জয়ের পথে পথে কীর্তি ছড়িয়ে এসেছেন গার্দিওলা। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের পর প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় কোচ হিসেবে ট্রেবল জিতলেন তিনি। প্রথম কোচ হিসেবে দুটি ভিন্ন দলের হয়ে ট্রেবল জিতলেন গার্দিওলা। এর আগে ২০০৮-০৯ সালে বার্সেলোনার হয়ে ট্রেবল জিতেছিলেন এ স্প্যানিশ কোচ।
ফার্ডিনান্ড ম্যানসিটিকে অমরত্ব দিলেও গার্দিওলাকে দেননি। সেটাও বিনাবাক্যে দিয়ে দিলেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক ডিফেন্ডার উডগেট। তার ভাষায়, ‘এটা নিশ্চিত যে গার্দিওলা সর্বকালের সেরা। ফুটবলকে আমরা যেভাবে দেখতাম, তা সে বদলে দিয়েছে।’
আসলে গার্দিওলা তো পুরো ম্যানচেস্টারই বদলে দিয়েছেন। ইতিহাদের সবুজ গালিচায় আকাশী রংয়ের উৎসবের মায়েস্ত্রো তো তিনিই। সর্বকালের সেরার বিতর্ক মিলিয়ে যাক উৎসবের রংঙে, ইতিহাদের গর্জনে।