আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুরা আগামীর জাতি গড়ার কাণ্ডারী। একজন শিশু সুনাগরিক হিসেবে গঠনের গুরুদায়িত্ব পরিবার প্রাকৃতিক নিয়মেই পেয়েছে। প্রকৃতির মাঝে সকল জীব যেমন লালিত-পালিত হয়, তেমনই শিশুর সামাজিকীকরণ ও চরিত্র গঠনে পরিবারের শিক্ষাই প্রধান। শিশুরা আদব-কায়দা, আমল-আখলাক, নৈতিক শিষ্টাচার, উত্তম আচার-আচরণ, সুন্দর চলা-ফেরা সবকিছু পরিবার থেকে প্রথম শিক্ষা পেয়ে থাকে।
পরিবার বলতে বিশেষ করে পিতা-মাতার সান্নিধ্যই একটি শিশুকে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। জন্মের পর থেকে পিতা-মাতাই শিশুর সার্বিক পর্যবেক্ষণ করেন। শিশুর প্রত্যেক জিনিসের হাতেখড়ি হয় পিতা-মাতার কাছেই। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটি বিশেষ নেয়ামত হচ্ছে শিশুদের ব্রেইন শার্প এবং ক্যাপচার ক্যাপাবিলিটি। আরও সহজ করে বলতে গেলে- শিশুরা তার চারপাশের ঘটিত খুব সূক্ষ্ম বিষয়াবলিও সহজেই ধারণ করতে পারে। এসময় পিতা-মাতাসহ পরিবারের সবাইকে শিশুর বিষয়ে যত্মবান ও সচেতন হওয়া জরুরি। কারণ সে যা কিছু দেখছে সবকিছু নিজের ব্রেইনে ধারণ করছে।
বর্তমানে দেশের শহরাঞ্চলে দেখা যায়, অধিকাংশ পিতা-মাতা চাকরিজীবী হওয়ায় শিশুকে যথাযথ যত্ন ও সময় দিতে সক্ষম হচ্ছে না। এর ফলে শিশুকে যার তত্ত্বাবধানে রাখা হয় তাকেই প্রতিটা ক্ষেত্রে অনুসরণ করে; আচার-আচরণ, কথা বলার ধরন, মন-মানসিকতা প্রভৃতিসহ একটি শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে যত প্রভাব লক্ষণীয় সবকিছুই তত্ত্বাবধায়কের আদলেই হয়ে উঠে।
এজন্য শুরু থেকেই পিতা-মাতার উচিত শিশুকে পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহানুভূতি প্রভৃতি বিষয়ের সাথে ধীরে ধীরে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান, সামাজিক শ্রেণি,পারিবারিক কাঠামো, পিতা-মাতার সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলোও শিশুর আচরণ অনুধ্যানের ক্ষেত্রে সমহারে জড়িত।
তাছাড়া ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরিকরণে শিশুদের সঙ্গে পরিবারের সুসম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য শিশুকে ভালোভাবে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও আন্তরিক ভুমিকা পালন করা।
শিশুর সুষ্ঠু বিকাশে পরিবারের শিক্ষা সম্পর্কে বিগত দশকগুলোতে অনেক লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে। সব লেখক, গবেষক স্বীকার করেছেন যে পরিবারের শিক্ষা ও সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া শিশুর বিকাশে সুষ্ঠু ধারা ও সন্তোষজনক অগ্রগতি সম্ভব নয়। একজন শিশুর মানসিক, শারীরিক বিকাশের জন্য উত্তম পরিচর্যার বিকল্প নেই।
সম্প্রতি আরও মারাত্মক বিষয় লক্ষ্মণীয় যে, অনেক মায়েরা সন্তান যখন কান্না করে, জেদ ধরে তখন তাদের কান্না থামানোর জন্য মোবাইলকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। স্মার্টফোন তাদের ব্রেইনকে সংকুচিত করে এবং আসক্তি বৃদ্ধি করে। সন্তান যখন রাগ করে, কান্না করে, জেদ করে তখন তাদের ভালোভাবে আদর, সোহাগ, মায়া-মমতা দেওয়া উচিত অথবা বিভিন্ন ধরনের খেলনা আছে সেগুলো দেওয়া উচিত। সবচেয়ে বেশি তাদের সময় দেওয়া উচিত।
তারা জানতে চাই, শিখতে চাই, তারা যেভাবে চাই সেভাবে শেখানো উচিত। তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো উচিত। কিন্তু এগুলোর পরিবর্তে যখন মোবাইল হাতে দেয়; সে আস্তে আস্তে মোবাইল আসক্ত হয়ে উঠে। ইউটিউব, ফেসবুক রিলস, মোবাইল গেইমে আসক্ত হয়ে যায়। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে উগ্র আচরণের হয়ে উঠে। সে এটাকে নিজের গণ্ডি হিসেবে ধরে নেয়। সে সময় মতো মোবাইল না পেলে অনেক অঘটনও ঘটিয়ে বসে। এজন্য অভিভাবকদের উচিত- শিশুদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখা এবং আদর, স্নেহ, মায়া মমতায় গড়ে তোলা।
প্রতিটি শিশুদের মধ্যে লুকিয়ে আছে নানান রকমের প্রতিভা। তার প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ভুমিকা রাখতে হবে পরিবার, মা-বাবা এবং শিক্ষকের। তাকে ভালভাবে পরিচর্যা করে আগামীর কর্ণধার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তার সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সেইজন্য পারিবারিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা