ক্যাম্পাস

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন: যে কারণে ফাঁসি হয় বিপ্লবী রামকৃষ্ণের

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অমর বিপ্লবীর নাম রামকৃষ্ণ বিশ্বাস। তিনি ভারতের বিপ্লবী সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। বিশেষ করে, চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা, বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনসহ বিভিন্ন বিপ্লবী কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন তিনি। 

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের জন্ম ১৬ জানুয়ারি ১৯১০ সালের চট্টগ্রামের সারোয়াতলী গ্রামে। তার পিতা দুর্গাকৃপা বিশ্বাস এবং মাতা নয়নতারা দেবী। তিনি ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯২৮ সালে জেলায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় বোনের বাড়িতে থেকে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। মূলত কলেজে অধ্যয়নকালেই তার মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাস শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৩০ সালে বোমা তৈরির সময় গুরুতর আহত হন। এরপরও তিনি বিপ্লবী সংগঠনের জন্য কাজ চালিয়ে যান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুপ্ত সদস্য ছিলেন বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়। যিনি বিপ্লবীদের কাজে সামরিক সরঞ্জাম প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা করতেন। একদিন মনোরঞ্জন রায় চট্টগ্রামে বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের কাছে বোমা পৌঁছে দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসার সময় ১৯৩০ সালের ২৪ নভেম্বর পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

ফলে ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রামে স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের দমন করতে টিজে ক্রেগকে বাংলার পুলিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ করে। কথিত আছে, তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর নির্মম অত্যাচার করতেন। বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন এর প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩০ সালের ১ ডিসেম্বর চাঁদপুর স্টেশনে ট্রেনে আসবেন ক্রেগ- এ খবর পেয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তবে এই দায়িত্ব প্রদান করা হয় রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালীপদ চক্রবর্তীকে।

রামকৃষ্ণ ও কালীপদ ১ ডিসেম্বর চাঁদপুর স্টেশনে পৌঁছান এবং ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন। ট্রেন আসার পর তাঁরা খাঁকি উর্দি ও ওভারকোট পরা এক ব্যক্তিকে টি. জে. ক্রেগ ভেবে গুলি করেন। কিন্তু ভুল করে ক্রেগের পরিবর্তে রেলের ইন্সপেক্টর তারিণী মুখোপাধ্যায় গুলিতে নিহত হন।

রেল ইন্সপেক্টর হত্যার পরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও কালীপদ চক্রবর্তীকে বোমা ও রিভলবারসহ গ্রেপ্তার করে। তারা ২২ মাইল দূরে পালিয়ে গিয়েও পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এ মামলায় রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে সেলুলার জেলে পাঠানো হয়।

আলিপুর জেলের ফাঁসির সেলে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে তার আত্মীয়দের কারো দেখা করা সম্ভব হয়নি। কারণ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসা তাদের জন্য ব্যয়বহুল ছিল। এ খবর জানার পর বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করলেন।

বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়ের মা যখন হিজলি জেলে ছেলের সঙ্গে (মনোরঞ্জন রায়) দেখা করতে যান, তখন গোপনে প্রীতিলতা বরাবর লেখা একটি চিঠি তিনি (মনোরঞ্জন রায়) তার হাতে দেন। প্রীতিলতা ‘অমিতা দাস’ ছদ্মনামে আলিপুর জেল কর্তৃপক্ষের কাছে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের কাজিন পরিচয়ে দরখাস্ত করেন এবং অনুমতিও পেয়ে যান। প্রায় ৪০ বার তার সঙ্গে দেখা করেন। এ সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রীতিলতা বলেন-

‘তার গাম্ভীর্যপূর্ণ চাউনি, খোলামেলা কথাবার্তা, নিঃশঙ্ক চিত্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, ঈশ্বরের প্রতি অচলা ভক্তি, শিশুসুলভ সারল্য, দরদী মন ও প্রগাঢ় উপলব্ধিবোধ আমার উপর গভীর রেখাপাত করল। আগের তুলনায় আমি ১০ গুণ বেশি কর্মতৎপর হয়ে উঠলাম। আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত এ স্বদেশপ্রেমী যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ আমার জীবনের পরিপূর্ণতাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল।’ 

১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি কার্যকর করে। তার এ আত্মত্যাগ চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রীতিলতা পরবর্তীতে আরো সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক নীতি নিতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের অমর আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তার এ ত্যাগ আমাদের পরবর্তী বিপ্লবগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসসহ বিপ্লবীদের ব্রিটিশ শাসনামলের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাদের আজকের প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগায়।

৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২৪ এর জুলাই বিপ্লবে তাদের পরোক্ষভাবে ভূমিকা ছিল। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এসব বিপ্লবীদের নাম। (লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)

তথ্যসূত্র : মাস্টারদা সূর্য সেন (রাশেদুর রহমান), DO AND DIE: The Chittagong Uprising: 1930-34 (Manini Chatterjee), সূর্য সেনের সোনালি স্বপ্ন (রুপময় পাল), প্রীতিলতা (সম্পাদনা শংকর ঘোষ), সাহসী বাঙালি চরিতবিধান (সুবোধ সি. সেনগুপ্ত এবং অঞ্জলি বসু)।