বিনোদন

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়

লিমন আহমেদঢাকা, ২২ জুন : আতিকুল হক চৌধুরী। সুদীর্ঘ সময় ধরে সাংস্কৃতিক জগতের অনন্য এক নাম। টিভি নাট্যজগতের পথিকৃত, বরেণ্য, খ্যাতিমান, বর্ষীয়ান কিংবা কিংবদন্তী-সব ক’টি বিশেষণই তার নামের পাশে ফ্যাকাশে।

নিজেকে তিনি কাজ-কর্মে নিয়ে গেছেন উপমার উর্ধ্বে। বাংলাদেশের নাট্যজগতে তিনি চিরস্মরণীয় এক বিস্ময় ব্যক্তিত্ব।

জন্ম ও পরিবার

আতিকুল হক চৌধুরী বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থানার উলানিয়া গ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদারবাড়ির সন্তান। জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভোলার বাটামারা গ্রামে, মামাবাড়িতে।

আতিকুল হক চৌধুরীর দাদার নাম আবদুস সোবহান চৌধুরী ও পিতা সেরাজুল হক চৌধুরী। তার মা ছিলেন সৈয়দা লুৎফুন্নেসা বেগম (রওশন আরা)। চার ভাইয়ের মধ্যে আতিকুল হক চৌধুরীই ছিলেন সবার বড়। অন্য ভাইয়েরা হলেন রেজাউল হক চৌধুরী, নাসিরুল হক চৌধুরী ও ডা. লুৎফুল হক চৌধুরী।

আতিকুল হক চৌধুরী ১৯৫৪ সালের ৬ই জানুয়ারি ফরিদপুরের এডিসি জহুরুল হকের বড় মেয়ে জহুরা বেগম লিলির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে।  কনিষ্ঠ ছেলে মঈনুল হক চৌধুরী মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ২০০১ সালের ৪ঠা জুন ইন্তিকাল করেন।

শিক্ষাজীবন

আতিকুল হক চৌধুরীর স্কুলজীবন কেটেছে বিভিন্ন স্থানে। বরিশালের সাহেবগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ স্কুল, গৌরনদী হাইস্কুল, ভোলা সরকারি স্কুল, বরিশাল জেলা স্কুলে তিনি পড়াশোনা করেছেন।  ১৯৪৯ সালে ভর্তি হন বরিশালের বিএম কলেজে।

১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন।আতিকুল জক ৫২’র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

কর্মজীবন শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬০ সালে রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেয়ার মাধ্যমে আতিকুল হক চৌধুরী কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ১৯৯০ সালে আতিকুল হক বিটিভি থেকে অবসরে যান।

তারপর ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা দশ বছর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে দীর্ঘ ১১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ তিনি একুশে টেলিভিশনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

নাট্য ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক

তবে এইসব পরিচয় ছাপিয়ে আতিকুল হক সমাদৃত হয়েছেন একজন নাট্যব্যাক্তিত্ব হিসেবে। তার হাত ধরে এদেশের নাট্যপ্রেমী দর্শকেরা পেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় আর বার্তা নির্ভর নাটক। তিনি একাধারে ছিলেন নাট্য নির্মাতা ও প্রজোযক।

তবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নাটকের এই মহান পুরুষকে আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে আবুল হায়াত, হুমায়ুন ফরীদি, শর্মিলী আহমেদ, কেয়া চৌধুরী, মিতা চৌধুরী, জুয়েল আইচ, আফরোজা বানু, মেঘনা, শম্পা রেজা, শমী কায়সার, সালমান শাহর মতো গুণী অভিনয় শিল্পীদের আবিষ্কারের জন্য। অভিনয়ের নানা অঙ্গনের এই নক্ষত্রেরা আতিকুল হক চৌধুরীর হাত ধরেই শোবিজে পথচলা শুরু করেছিলেন।

দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ারে টিভিতে তার উল্লেখযোগ্য রচিত নাটকের মধ্যে রয়েছে বাবার কলম কোথায়, দূরবীণ দিয়ে দেখুন, যদি দূরের পথ, অন্বেষণ, জলাশয় কতোদূর, গাইড, নিঝুম দ্বীপের সন্ধানে, সন্ধি কতদিন, কোথায় যাবো?, কম্পাস, সাতদিনের ছুটি, সাড়ে তিনহাত, ধূসর প্রাসাদ ইত্যাদি।

প্রায়  ৩০০’র ওপরে নাটক তিনি প্রযোজনা করেছেন। নিজের রচিত নাটকগুলো প্রযোজনা ছাড়াও তার প্রযোজিত অন্য উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হল-শ্যামল ছায়া, বিচারক, মালঞ্চ, নিঃশ্বাসের কাছাকাছি, আপন গন্তব্যে যাব, প্রতিচ্ছবি, অশ্রুত গান্দার, পটভূমি পরিচিতি, রাতের পাখিরা, কোথায় যাব, আমার কথা লিখুন, পরিণীতা, মানভজন, সোনার কাঠি রূপার কাঠি, তার রহস্যময় হাসি, নিখোঁজ সংবাদ, দেয়াল, কুসুম,  বারো ঘরের ঘরণী, রূপার কৌটা প্রভৃতি।

অর্জন ও স্বীকৃতি

একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ হিসেবে আতিকুল হকের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি তিনি সংস্কৃতিকে নিজের গভীরে ঠাঁই দিতে পেরেছিলেন। আপাদমস্তক একজন মুক্ত-স্বাধীন-অসাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ ছিলেন তিনি। তার সবচাইতে বড় অর্জন স্বদালাপী, স্বদা-হাস্যোজ্জল স্বভাব। খুব সহজেই মুগ্ধ হতেন;করতেনও।

আতিকুল হক তার কর্মের স্বীকৃতি পেয়েছেন দর্শকদের কাছে। এছাড়াও নাট্য প্রযোজক হিসেবে তিনি ১৯৭৬ সাল লাভ করেন জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার।

অর্জন করেছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সংস্থা পুরস্কার, সিকোয়েন্স পুরস্কার, শেরেবাংলা স্মৃতি পুরস্কার, স্যার সলিমুল্লাহ স্মৃতি পুরস্কার, রংধনু পুরস্কার, অগ্রপথিক পুরস্কার, ঋষিজ পদক, নাট্যসভা পদক, লাইফ পুরস্কার, টেনাসিনাস পুরস্কার, যায়যায়দিন পুরস্কার, তারকালোক পুরস্কার, কথক সাংস্কৃতিক পুরস্কার, ঢাকা আর্টস কাউন্সিল পুরস্কার, অর্জন সাংস্কৃতিক পুরস্কার, আনন্দ থিয়েটার পুরস্কার, টেলিভিশন প্রযোজক সমিতি পুরস্কার, ঢাকা লায়ন্স পদকসহ আরও নানা পুরস্কার।

তিনি নয়াদিল্লিস্থ বিশ্ব উন্নয়ন সংসদ কর্তৃক সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছিলেন।আতিকুল হক চৌধুরী বাংলা একাডেমির সম্মানীত ফেলো ছিলেন।

মহাপ্রয়াণ

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন এই নাট্যজন। প্রোস্টেট ক্যান্সার, ডায়বেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে তিনি কিছুদিন আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কিন্তু চিকিৎসকরা হাল ছেড়ে দেয়ায় তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

আবারও হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় দ্বিতীয় দফা হাসপাতালে নেয়ার পর পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জুন, সোমবার রাতে মারা যান আতিকুল হক চৌধরী।  তার মৃত্যুতে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮২ বছর।

শেষ শ্রদ্ধা এবং বিদায়

আতিকুল হকের কফিন শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয় মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে সর্বস্তরের মানুষ সেখানে এই নাট্যকারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

সর্বপ্রথম আতিকুল হকের কফিনে ফুল দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। এরপর একে একে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপাদেষ্ঠা এ জেড এম জাহিদুল ইসলাম, নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, রামেন্দু মজুমদার, শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সহ সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের কর্মীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান এই নাট্যকারের প্রতি।

মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে এবং বেলা আড়াইটায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে আতিকুল হকের জানাজা হয়। জানাজা শেষে ওইদিন বিকালে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

শ্রদ্ধাঞ্জলী

চলে গেলেন খ্যাতিমান নাট্যকার, পরিচালক ও শিক্ষাবিদ আতিকুল হক চৌধুরী! চোখের দেখায় তিনি অদেখা হয়ে রইবেন বটে; কিন্তু ভালবাসার আসনে তিনি তার ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে চির অমর হয়ে থাকবেন। তার কর্ম-জীবন-আদর্শ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের প্রিয় নাট্যাঙ্গনে, আমাদের মনে প্রাণে।

তার মতো মানুষের চলে যাওয়া থাকতেই পারে, প্রস্থান হয়না কোনোদিন। যেখানেই থাকুন, প্রিয় আতিকুল হক চৌধুরী ভাল থাকুন সবসময়;চির পরিচিত হাসিমুখে।

 

রাইজিংবিডি/এলএ