দীর্ঘ দেড় যুগ পর বীরের বেশে দেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে লন্ডন থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরলেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার অবতরণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।ভিআইপি লাউঞ্জের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বুলেট প্রুফ গাড়িতে করে তারেক রহমান যাবেন জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের (তিনশ ফিট সড়ক) কাছে সংবর্ধনার অনুষ্ঠানস্থলে। সেখানে মঞ্চে উঠে নেতা-কর্মীসহ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার অসুস্থ মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন।
এর আগে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তার আগমন উপলক্ষে এ বিমানবন্দরে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
সিলেট বিমানবন্দরে পৌঁছে ফেসবুকে তারেক রহমান লেখেন, “অবশেষে সিলেটে, বাংলাদেশের মাটিতে!” এর আগের পোস্টে তিনি লেখেন, “দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!”
বিএনপির দৃষ্টিতে, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অপেক্ষার অবসান। তাকে স্বাগত জানাতে ঢাকায় আসেন লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
মায়ের অসুস্থতা ও দেশের টান তারেক রহমানের দেশে ফেরার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন এবং বর্তমানে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। মায়ের পাশে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, দেশের প্রতি গভীর আবেগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, এই তিনটি বিষয় মিলিয়েই দেশে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তারেক রহমান।
লন্ডনে গত ১৬ ডিসম্বের এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, “ইনশাআল্লাহ ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরব।” তার কন্যা জাইমা রহমানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানান, দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠনে ভূমিকা রাখতে চান তার বাবা।
ঐতিহাসিক জনসমাগম তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ঐতিহাসিক করে তুলতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। তাকে স্বাগত জানাতে পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে (তিনশ ফিট সড়ক) জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী রাতেই সমাবেশস্থলে অবস্থান নিয়েছেন। অনেককেই রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। মঞ্চ আর আশপাশের এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই, পুরো এলাকায় চলছে উৎসবের আমেজ।
সবার মুখে মুখে একটি স্লোগান বেশি শোনা যাচ্ছে, ‘লিডার আসছেন’। স্লোগান, প্ল্যাকার্ড আর উচ্ছ্বাসে পুরো সমাবেশস্থল উৎসব কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা বাস, ট্রেন ও নৌপথে ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ ১০টি ট্রেন চালু করে। ঢাকার গাবতলী, সায়দাবাদসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই ব্যানার, পোস্টার ও দলীয় পতাকা নিয়ে মিছিল সহকারে সংবর্ধনায় যোগ দেন।
উৎসবের আমেজ ও জনসমাগম পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত পোস্টার ও ফেস্টুনে ছেয়ে যায় এলাকা। মঞ্চের মাইকে বাজানো হয় দেশাত্মবোধক গান। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুরো এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও হোয়াইট—এই তিনটি জোনে ভাগ করা হয়। রেড ও ইয়েলো জোনে প্রবেশের জন্য বিশেষ সিকিউরিটি কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়। ড্রোন উড়ানো নিষিদ্ধ এবং ভিজিটর প্রবেশ সীমিত করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সক্রিয় ছিল। বুলেটপ্রুফ গাড়িসহ বিশেষ নিরাপত্তা বহর প্রস্তুত রাখা হয়।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শাহরিয়ার আলী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ডিএমপির পক্ষ থেকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. বাহারুল আলম বলেন, “বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার সুরক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পোশাকে ও সাদা পোশাকে মোতায়েন থাকবেন।”
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদারে বিমানবন্দর, ৩০০ ফিট ও গুলশানসহ ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এছাড়া, বিএনপির পক্ষ থেকে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে তার নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ প্রবাস জীবন তারেক রহমানের প্রবাস জীবন শুরু হয় ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তিনি। এরপর থেকে প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। এমনকি ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হলেও দেশে ফিরতে পারেননি, যা তার ব্যক্তিগত জীবনে গভীর বেদনার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রবাসে থাকলেও দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি তারেক রহমান। লন্ডনে বসেই তিনি ভার্চুয়াল নেতৃত্ব দিয়েছেন, দলীয় কৌশল নির্ধারণ ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন, তার অনুপস্থিতিতেও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মামলা ও আইনি জটিলতার অবসান ২০০৭-২০০৮ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়। দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলাসহ গুরুতর অভিযোগে মোট ৮৪টি মামলা হয় তার নামে। বিএনপি বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক বলে দাবি করে আসছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব মামলার পুনর্বিবেচনা হয়। পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তারেক রহমান সব মামলায় খালাস পান। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, তার দেশে ফেরায় কোনো আইনগত বাধা নেই। প্রয়োজনে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। এতে তার প্রত্যাবর্তনের পথ পুরোপুরি সুগম হয়।
বিএনপির নতুন করে পথচলার সংকল্প তারেক রহমানের দেশে ফেরা দেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণে বিএনপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলেছে।
দলটির অনেক নেতা প্রকাশ্যে বলছেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক মনোবল বহুগুণ বাড়াবে। কেউ কেউ তাকে সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামনে তার জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে থাকবে।
সামনে পথচলার চ্যালেঞ্জ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিঃসন্দেহে দেশের রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা। এটি বিএনপির জন্য যেমন নতুন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি দেশের রাজনীতিতেও নতুন হিসাব-নিকাশের সূচনা করেছে। সামনে তিনি কীভাবে দলকে নেতৃত্ব দেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কী ভূমিকা রাখেন এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে কীভাবে এগিয়ে নেন, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।