রাজনীতি

প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে যেমন ছিল খালেদা জিয়ার নির্বাচনি প্রচার

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনি প্রচারে উল্কার মতো সারাদেশে ছুটে বেড়ান। মাত্র পাঁচ দিনের নির্বাচনি সফরে তিনি চারটি জেলায় ৭১টি জনসমাবেশে বক্তব্য দেন। নির্বাচনের আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহেই তিনি অংশ নেন ২০১টি সভায়।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর দেশে দলীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়। একসময় যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোই নির্বাচনের ময়দানে একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষে পরিণত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে উঠে আসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংসদীয় শাসনব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ ও আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা।

১৯৯১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচননি প্রচারণার সময় এক সমাবেশে খালেদা জিয়ার হাতে উপহার হিসেবে ধানের শীষের একটি ভাষ্কর্য তুলে দেন দলের নেতাকর্মীরা।

দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাক পত্রিকায় ১৯৯১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে প্রকাশিত শিরোনামগুলোতে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের রাজনৈতিক তীব্রতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

তিনি বলেন, “জনগণের গণতন্ত্রের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা তিনি চান না, নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এবং ধানের শীষে ভোটের জোয়ার উঠেছে।” 

১৯৯১ সালের একটি দেয়ালচিত্রে খালেদা জিয়া

একাধিক বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগকে একদলীয় শাসন কায়েম, দেশ বিক্রি ও স্বাধীনতার চেতনাকে ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ করেন।

নির্বাচনি প্রচারে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বাহিনী শক্তিশালী করা, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান, স্বনির্ভর গ্রাম গঠন এবং জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। একইসঙ্গে সন্ত্রাস, ভোটার তালিকার অনিয়ম ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। ভোট দেওয়ার পর তিনি বলেন, “দীর্ঘ নয় বছর পর জনগণ সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারছে, এটি আনন্দের।” তিনি ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগও তোলেন। 

১৯৯১ সালের নির্বচনে বিএনপির পোস্টার

নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২ হাজার ৭৮০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৯৩১ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ৯৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ২৩টি দলের সব প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।  নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। ছয়টি আসনে নির্বাচন স্থগিত ছিল। ক্ষমতার বাইরে থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

১ মার্চ খালেদা জিয়া নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ভোটার তালিকায় অনিয়ম না হলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত।” তবে, নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

২ মার্চ বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে খালেদা জিয়া সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। এর মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব গ্রহণ কার্যত নিশ্চিত হয়। 

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন খালেদা জিয়া।

ওই বছর ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্যে দিয়ে তিনি ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ও বেনজির ভুট্টোর মতো দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী নারী নেতৃত্বের তালিকায় নাম লেখান।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি আনন্দিত। জনগণের দোয়া কামনা করেন খালেদা জিয়া।

তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অসমাপ্ত কাজগুলো তিনি সম্পন্ন করবেন।

১৯৯১ সালের বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল আওয়ামী লীগ। ওই সময়ে নির্বাচনের আগে দুই দলের প্রধানরা ছুটে বেরিয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। নির্বাচনি সভায় নানা প্রতিশ্র্রুতি দিয়ে বক্তব্য দেন তারা, যা পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। তবে, লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘খালেদা’ বইয়ে শুধু দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাক পত্রিকায় ১৯৯১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে প্রকাশিত শিরোনামগুলো উল্লেখ করেছেন।