যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন জোহরান মামদানি।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) নতুন বছরের প্রথম প্রহরে ম্যানহাটনের একটি পরিত্যক্ত ঐতিহাসিক সাবওয়ে স্টেশনে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে এই শপথ গ্রহণ করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। খবর আল-জাজিরার।
এই শপথের মাধ্যমে ৩৪ বছর বয়সী মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম এবং গত কয়েক প্রজন্মের মধ্যে কনিষ্ঠতম মেয়র হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। শপথ অনুষ্ঠানে তিনি পবিত্র কোরআনের ওপর হাত রেখে তার দাপ্তরিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শপথ অনুষ্ঠানে মামদানি তার দাদার ব্যবহৃত কোরআন এবং নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে সংগৃহীত ২০০ বছরের পুরোনো একটি কোরআন ব্যবহার করেন। নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস তাকে এই ঐতিহাসিক শপথবাক্য পাঠ করান, যা শহরটির বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
মধ্যরাতের এই ঘরোয়া অনুষ্ঠানের পর দুপুর ১টায় নিউ ইয়র্কের সিটি হলে আয়োজিত একটি বড় ধরনের জনসমাবেশে তিনি পুনরায় শপথ নেবেন। এ অনুষ্ঠানে মামদানি তার দাদা ও দাদির ব্যবহৃত দুটি কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। এই মূল অনুষ্ঠানে মামদানির অন্যতম রাজনৈতিক আদর্শ ও মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তাকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন এবং কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ উদ্বোধনী বক্তব্য রাখবেন। এরপর ব্রডওয়ের ‘ক্যানিয়ন অব হিরোস’-এ একটি বর্ণাঢ্য গণসংবর্ধনা ও ব্লক পার্টির আয়োজন করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাতেগোনা কয়েকজন রাজনীতিবিদের মধ্যে মামদানি একজন, যারা ধর্মীয় গ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়েছেন। নিউ ইয়র্কে মেয়রের শপথ গ্রহণের জন্য কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়, তবে অতীতের অনেক মেয়র বাইবেল ব্যবহার করেছেন।
সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ তার পারিবারিক ১০০ বছরের পুরোনো বাইবেল ব্যবহার করেছিলেন, বিল ডি ব্লাসিও ব্যবহার করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের একটি বাইবেল। আর মামদানির পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসও শপথের জন্য পারিবারিক বাইবেল ব্যবহার করেছিলেন।
উগান্ডায় জন্ম নেওয়া দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান হিসেবে মামদানির ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তার পরিচিতি নির্বাচনী প্রচারণার মূল কেন্দ্রে ছিল, যেখানে তিনি নিউ ইয়র্কের বৈচিত্র্যকে উদযাপনের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে মামদানি ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। অন্যান্য ভিডিওতে তিনি নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
এছাড়া মামদানি ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতি এবং গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
নিউ ইয়র্কের প্রতিনিধি এলিস স্টেফানিকের মতো সমালোচকরা মামদানির ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে তার বামপন্থি রাজনীতি নিয়ে আক্রমণ করেছেন। তিনি মামদানিকে ‘জিহাদি কমিউনিস্ট’ এবং ‘সন্ত্রাসীদের’ সহযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তবে মামদানি তার নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি কখনোই নিজের পরিচয় গোপন করবেন না। মামদানি বলেছিলেন, “আমি কে, আমি কী খাই বা আমার গর্বিত ধর্মীয় বিশ্বাস- এগুলোর কোনোটিই আমি পরিবর্তন করব না। আমি আর অন্ধকারের ছায়ায় নিজেকে খুঁজব না। আমি আলোর মাঝেই নিজেকে খুঁজে নেব।”