ডুমস্ক্রলিং হলো কোনো জরুরি কারণ ছাড়াই একটানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিউজ পড়তে থাকা। এই অভ্যাস উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ বাড়ায়। অনেকে কাজের চাপ, অনিশ্চয়তা, হতাশা—সবকিছু থেকে পালাতে গিয়ে ডুবে যান এই স্ক্রলিংয়ের স্রোতে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কানাডায় আসা হেইজি জিয়ংও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু মাত্র এক বছরে সেই স্ক্রলিং বাদ দিয়েই নিজের জীবন পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন তিনি।
হতাশা থেকে সিদ্ধান্ত ২০১৭ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান হেইজি। পড়াশোনা শেষ হলেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় ধীরে ধীরে হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলেন। সময় কাটত ফোন স্ক্রল করে। ২০২৪ সালে ২৯তম জন্মদিনে এসে নিজের সঙ্গে একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি করেন হেইজি ‘জীবন থেকে ডুমস্ক্রলিং বাদ দেবেন’। আর ২০২৫ সালকে বেছে নেন জীবন গুছিয়ে নেওয়ার বছর হিসেবে। ২০২৫ সালের শেষে এসে ইনস্টাগ্রামে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন তিনি। হেইজির ভাষায়, স্ক্রলিং বাদ দিয়ে যে ১০টি কাজ করে তিনি নিজের জীবন বদলে ফেলেছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো—
১. সময় ফিরে পাওয়া ও ক্যারিয়ারে বড় সাফল্য মুঠোফোন দূরে রাখতেই বুঝতে পারেন, তার হাতে আসলে কত সময় ছিল। প্রথমেই সিভি আপডেট করেন, নিয়মিত চাকরির আবেদন শুরু করেন। সাড়ে চার মাসের মধ্যেই পান কাঙ্ক্ষিত চাকরি। নতুন চাকরিতে তার বেতন বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। বর্তমানে তার বাৎসরিক আয় ২ লাখ ২৪ হাজার কানাডীয় ডলার।
২. কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে উত্থান ২০২৫ সালের শুরুতে প্রথম কনটেন্ট বানানোর সময় নিজেকে খুব ‘ক্রিঞ্জ’ মনে হয়েছিল বলে জানান হেইজি। কিন্তু দর্শকদের ভালোবাসায় তার অষ্টম কনটেন্টই ভাইরাল হয়। ফলোয়ার ২০০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজারে। বর্তমানে তার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার ১ লাখ ৬৯ হাজার।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ২০২৫ সালে তিনি ২৪টি থেরাপি সেশন সম্পন্ন করেছেন। হেইজির ভাষায়, জীবনের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তিনি সবচেয়ে সুখী ও নির্ভার। নিজেকে ক্ষমা করতে শিখেছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক ভার অনেকটাই ঝেড়ে ফেলেছেন। যদিও থেরাপিতে তার সঞ্চয়ের বড় অংশ খরচ হয়েছে, তবু তিনি মনে করেন—এই বিনিয়োগ তাকে ভবিষ্যতে আরও বড় আয় করার জন্য প্রস্তুত করেছে।
৪. মানবিক কাজে যুক্ত হওয়া অক্টোবরে অনাথ শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি ফাউন্ডেশনে তিনি ১ হাজার ডলার দান করেন। ভবিষ্যতে এই শিশুদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
৫. ভ্রমণের নতুন অভিজ্ঞতা ২০১৭ সালে কানাডায় আসার পর ২০২৫ সালের আগে কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরে কোথাও যাননি হেইজি। ২০২৫ সালেই তিনি ঘুরেছেন ৭টি দেশের ১২টি শহর। আগামী বছর থেকে আবার সঞ্চয়ে মন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
৬. অন্তর্মুখী হয়েও অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা নিজেকে সব সময় অন্তর্মুখী বলে মনে করতেন হেইজি। অথচ ২০২৫ সালে তিনি দুটি অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দিয়েছেন। শ্রোতারা কতটা অনুপ্রাণিত হয়েছেন জানেন না, তবে নিজের ভেতর তিনি নতুন এক আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছেন।
৭. বই লেখার শুরু জীবন গুছিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখতে শুরু করেছেন তিনি। আশ্চর্যের বিষয়, বইটির প্রথম খসড়াই একজন প্রকাশকের পছন্দ হয়েছে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালেই প্রকাশ পেতে যাচ্ছে হেইজির প্রথম বই।
৮. ফ্যাশন লেবেলের স্বপ্ন নিজের ফ্যাশন লেবেল গড়ার লক্ষ্যেও এগোচ্ছেন হেইজি। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে ১৬টি অনলাইন কোর্স শেষ করেছেন। ২০২৬ সালে এই স্বপ্ন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
৯. মানসিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা সব অর্জনের চেয়েও বড় সাফল্য হিসেবে হেইজি দেখছেন নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও আর্থিকভাবে ‘খানিকটা’ স্থিতিশীল হয়ে ওঠাকে।
১০. জীবন উপভোগ করতে শেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—৩০ বছরে পা দিয়ে তিনি জীবন উপভোগ করতে শিখেছেন। ভয়ে ভয়ে, অনিশ্চয়তা নিয়েই সবকিছু করেছেন। কোনো সময়ই নিশ্চিত ছিলেন না পারবেন কি না। তবু চেষ্টা থামাননি।
সুতরাং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় স্ক্রলিংয়ে ব্যয় না করে নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নের ব্যয় করা উচিত। হেইজির জীবনের গল্প সেই বার্তাই দিচ্ছে।