আন্তর্জাতিক

মাদুরোর ঘনিষ্ঠদের হাতেই ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ

ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দি করার ঘটনাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী’ বলে প্রশংসা করেছেন। তবে এই ঘটনা তেল-সমৃদ্ধ দেশটিকে কে শাসন করছে, তা নিয়ে এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। 

রবিবার (৪ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) ট্রাম্প জানান, মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর দেশটির সরকারের শীর্ষ ক্ষমতাধর গ্রুপের অন্যতম সদস্য ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ শপথ গ্রহণ করবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো দাবি করেন, রদ্রিগেজ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে তিনি দেশের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন এবং শনিবার গভীর রাতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত তাকে সেই দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেন।

কিন্তু ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরেই, রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হন। তার পাশে ছিলেন তার ভাই ও ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট।

তাদের এই যৌথ উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, মাদুরোর সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার এই গ্রুপটি আপাতত ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

শনিবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোকে সমর্থনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। মাচাদোকে মাদুরোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হলেও ট্রাম্পের দাবি, দেশের ভেতরে তার জনসমর্থন নেই।

মাদুরো সরকার ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাচাদোকে নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মাদুরো সরকার বিজয় দাবি করলেও মাচাদোর মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন।

বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভেনেজুয়েলার প্রকৃত ক্ষমতা একদল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হাতে সীমাবদ্ধ। বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের মতে, শাসক দলটি অনুগত বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি বিশাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।

এই অভ্যন্তরীণ বলয়ের মধ্যে একটি বেসামরিক-সামরিক ভারসাম্য বজায় থাকে। প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব স্বার্থ এবং প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকারী রদ্রিগেজ এবং তার ভাইয়ের প্রভাব রয়েছে বেসামরিক সেক্টরের ওপর, অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলোর প্রভাব হয়েছে সামরিক সেক্টরের  ওপর। 

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং ভেনেজুয়েলার সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষমতার কাঠামোর কারণেই কেবল মাদুরোকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা খুবই জটিল।

ভেনেজুয়েলার অপরাধ তদন্তে যুক্ত একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, “আপনি ভেনেজুয়েলা সরকারের যতগুলো অংশই সরান না কেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হলে বিভিন্ন স্তরের একাধিক পক্ষকে সরাতে হবে।”

সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলোকে নিয়ে, যার প্রভাব দেশটির সামরিক ও বেসামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স সংস্থাগুলোর ওপর রয়েছে। এই সংস্থাগুলো দেশজুড়ে ব্যাপক নজরদারি চালায়।

ভেনেজুয়েলার সামরিক কৌশলবিদ হোসে গার্সিয়া বলেন, “এখন সবার নজর দিওসদাদো কাবেলোর ওপর। কারণ তিনি এই সরকারের সবচেয়ে আদর্শিক, সহিংস এবং অনিশ্চিত চরিত্র।”

মূল খাতগুলো জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে

ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলো সামরিক বাহিনীর সাবেক একজন কর্মকর্তা ও সমাজতান্ত্রিক দলের প্রভাবশালী নেতা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনী পরিচালনা করলেও, কাবেলোর প্রভাব সশস্ত্র বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ওপর রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীতে প্রায় দুই হাজার জেনারেল এবং অ্যাডমিরাল রয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খাদ্য বিতরণ, কাঁচামাল এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি বহু জেনারেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেও রয়েছেন।

বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রায় এক ডজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং জেনারেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। তারা গোয়েন্দা তথ্যের বিনিময়ে নিরাপদ প্রস্থান এবং আইনি দায়মুক্তি চাইছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাবেলোর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি এই মুহূর্তে কোনো ধরনের আপস বা চুক্তিতে আগ্রহী নন।