ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এখন দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারকে বশে আনার কৌশল নিয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সূত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোর মতো পরিণতি বরণ করতে হতে পারে- এমন সামরিক হুমকির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।
স্থানীয় সময় রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেখানে সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করবে।
ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটন ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আরো সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি টেবিলে রয়েছে।” তিনি বলেন, “তারা যদি ঠিকঠাক আচরণ না করে, তবে আমরা দ্বিতীয়বার আঘাত করব।”
দ্বিতীয় দফার সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “এটি নির্ভর করবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর।”
ট্রাম্পের উপদেষ্টারা মনে করছেন, তারা পর্দার আড়ালে রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। রদ্রিগেজ জনসমক্ষে অবাধ্যতা দেখালেও মার্কিন কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে তিনি একজন ‘টেকনোক্র্যাট’। তারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান পরিস্থিতি এবং তেল সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হতে পারেন।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি চান রদ্রিগেজ যেন ভেনেজুয়েলার বিপর্যস্ত তেল অবকাঠামোসহ জরাজীর্ণ রাস্তা ও সেতু সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্র এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ‘পূর্ণ প্রবেশাধিকার’ প্রদান করেন। রদ্রিগেজ এবং অন্তর্বর্তী সরকার সহযোগিতা না করলে তাদের কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলেও ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন।
মাদুরোর কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, “আমি শুধু বলব যে, তিনি (রদ্রিগেজ) সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন।”
সূত্রমতে, মাদুরোর সহযোগীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা বা নিরাপদ নির্বাসনের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে- যা মাদুরো তার শেষ দিনগুলোতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গত শনিবার মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের হাতে বন্দি হওয়ার পর মাদুরো বর্তমানে নিউ ইয়র্কের একটি ডিটেনশন সেন্টারে আছেন এবং আজ সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এখনো দেশটিতে প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ এই দুই নেতার মাথার ওপর কয়েক মিলিয়ন ডলারের মার্কিন পুরস্কার ঘোষণা করা আছে। সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
এদিকে, ডেমোক্র্যাটরা যদি রিপাবলিকানদের একটি অংশকে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের অর্থায়ন বন্ধ করতে রাজি করাতে পারে, তবে ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শনিবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা আপাতত দেশটিতে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন না করেই বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তারের একটি চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দেশের মাটিতে সরাসরি যুদ্ধ বা সেনা মোতায়েনের পক্ষে মার্কিন জনগণের সমর্থন খুব একটা নেই।
মার্কিন কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে বিশাল সামরিক সমাবেশ বজায় রেখে এবং বিমান হামলা ও মাদুরোপন্থিদের টার্গেট করার হুমকি দিয়ে তারা দেশটির বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহযোগিতা আদায় করতে পারবেন।
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের কঠোর অবস্থান
ভেনেজুয়েলার শীর্ষ কর্মকর্তারা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের আটকের ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ চুরির চেষ্টা করছে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, তারা ঐক্যবদ্ধ আছেন।
ডেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন, যদিও তিনি দাবি করেছেন মাদুরোই দেশের প্রকৃত প্রেসিডেন্ট। রদ্রিগেজকে মাদুরো প্রশাসনের সবচেয়ে বাস্তববাদী নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি জনসমক্ষে অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প তার শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কিছুই বলেননি। তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী ও নোবেল বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও নাকচ করে দিয়েছেন, যা দেশটির বিরোধীদের হতাশ করেছে। ট্রাম্পের মূল নজর এখন ভেনেজুয়েলার জ্বালানি সম্পদ আহরণের দিকে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি হস্তক্ষেপকে অনেক সমালোচক ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ হিসেবে নিন্দা করছেন। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অনেক কর্মকর্তাও ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে বিস্মিত হয়েছেন, কারণ কারাকাসে দূতাবাস বা কর্মী পাঠানোর কোনো প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।