বন বিভাগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলনায় চিকিৎসাধীন আহত বাঘটির বাম হাতে ব্যাথার কারণে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তার পানিশুণ্যতা রয়েছে এবং বয়স্ক হওয়ায় দুর্বলতার কারণে বাঘটি শক্তি হারিয়েছে। ফলে এখনই শংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না। ফলে পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বন বিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত দুইদিন ধরে বাঘটি সামান্য খাবার গ্রহণ করেছে। একটু সুস্থ হওয়ার পর আজ বুধবার সকালে ভয়ংকর গর্জন দিয়েছে। মানুষ দেখলেই বাঘটি অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ফাঁদে আটকা পড়া বাঘটির বাম পায়ের শিরা, নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ত চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া বয়স্ক হওয়ায় বাঘটি তার স্বাভাবিক শক্তি হারিয়েছে। বাঘটিকে স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, বণ্যপ্রাণী সুরক্ষায় ও সুচিকিৎসার জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার আশপাশে একটি ভেটেনারি হাসপাতাল, কমপক্ষে দুইজন প্রাণী চিকিৎসক ও তাদের সহযোগী থাকা, আহত প্রাণীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সসহ একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নির্মাণে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, “গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ হতে উদ্ধারকৃত আহত বাঘটি বন বিভাগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলনায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। ধীরে ধীরে বাঘটির অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। বাঘটি প্রাথমিক অবস্থায় অত্যন্ত দুর্বল থাকলেও চিকিৎসা প্রাপ্তির পর এটি পানি পান ও খাদ্য গ্রহণ শুরু করেছে। ধীরে ধীরে বাঘটির বন্য ক্ষীপ্রতা ফিরতে শুরু করেছে।”
তিনি বলেন, “বন বিভাগের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাদ জুলকারনাইনের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন বাঘটি সম্পূর্ণ শংকামুক্ত না হওয়ায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নুর আলী খানের নেতৃত্বে ঢাকা হতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল মঙ্গলবার রাতে খুলনা পৌঁছান এবং আহত বাঘটিকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেন।”
বুধবার সকালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে বাঘটির অবস্থা সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করেন। ফাঁদে আটকে থাকার কারণে বাঘের সামনের বাম পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাঘটির চলনভঙ্গি দেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ধারণা করছেন যে এটির কোন হাড় ভাঙেনি, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
এই কর্মকর্তা আরো বলেন, “বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল আশা প্রকাশ করেন যে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাঘটি সুস্থ হয়ে বনে ফিরে যেতে পারবে। তবে বর্তমানে এটির ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়া চলছে বিধায় এটির কাছে মানুষের সমাগম হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি বন্য প্রাণি। যা কখনো মানুষের সংস্পর্শে আসেনি, তাই এটিকে সুস্থ করতে হলে এর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ (মাঝে)।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে ঢাকা সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হসপিটালের এডিশনাল ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, “বাঘটি বর্তমানে তিনটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, বাঘটির বাম হাতে পেইন হচ্ছে। এ অবস্থায় তার পক্ষে শিকার ধরা খুবই কঠিন। তাছাড়া ফাঁদের সুতায় বাম পায়ের শিরা, নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ত চলাচল বন্ধ ছিল। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হলেও শিরা, উপশিরাগুলো ঠিক হতে সময় লাগবে। বাঘটি হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। দ্বিতীয়ত, তার শরীরে পানিশুন্যতা রয়েছে। তবে গত দুই দিন সে পানি পান করেছে। যা সুস্থ হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে। তৃতীয়ত, বয়স্ক হওয়ায় বাঘটি তার শক্তি হারিয়েছে। ফলে এখনই শংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “এই তিনটি বিষয়কে বিবেচনায় রেখে ১০ দিনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এরপর কোর্স বদলাবে।”
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নুর আলী খান বলেন, “উন্নত চিকিৎসা প্রদানের জন্য আমরা মঙ্গলবার খুলনায় পৌঁছাই। ফাঁদে আটকা পড়ে ২-৩ দিন খিছুই খায়নি বাঘটি। এমনকি পানি পান না করায় পনিশুন্যতা দেখা দিয়েছে। দুই দিনে অল্প করে পানি পান করেছে। সামান্য মাংসও খেয়েছে। মাংসের সাথে মেডিসিন মিশিয়ে অল্প অল্প দেওয়া হচ্ছে। কাছে গেলে এটাকিং ভঙ্গি করছে। বিকট শব্দে গর্জনও করেছে। আমরা বাঘের আসল ভয়ংকর মুর্তি দেখতে পেয়েছি।”
তিনি বলেন, “এটি চিড়িয়াখানার বাঘ না। তাই মানুষ দেখলেই অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বাঘটিকে কোলাহলের বাইরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে জনসমাগম, কোন প্রকার ভিডিও ও ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে দুই সপ্তাহ বা দুই মাসও লাগতে পারে।”
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদ বিভাগের প্রফেসর ড. মো. গোলাম হায়দার, ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার (সিডিআইএল) প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার ডক্টর মো. গোলাম আযম চৌধুরী প্রমুখ।