প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অসুদোপায় অবলম্বনের অভিযোগে চার জেলায় আটক সাতজনের মধ্যে কাউকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, কাউকে জরিমান করা হয়েছে। বহিষ্কারও হয়েছেন কয়েকজন।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দেশজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়। আরো অনেক জেলার মতো যশোর, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ ও চাপাইনবাবগঞ্জে প্রতারণা ও অসুদোপায় অবলম্বনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
যশোরে পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থী ডিজিটাল ডিভাইসে নকল করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে যশোর সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে কলা ভবনের ১১৬ নম্বর কক্ষে পরীক্ষা চলাকালে এক পরীক্ষার্থীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়া তাকে আটক করেন ম্যাজিস্ট্রেট।
যশোর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক নাজমুল হাসান ফারুক জানান, আটক পরীক্ষার্থীর নাম ইশতিয়াক আহমেদ। পরীক্ষা চলাকালে তিনি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে নকল করার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি নজরে এলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিউল আলম সরাসরি তাকে হাতেনাতে আটক করেন।
ইশতিয়াক আহমেদের কাছ থেকে নকল করার জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ ডিভাইস উদ্ধার করা হয় জানিয়ে অধ্যাপক ফারুক বলেন, এ ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিউল আলম ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে ইশতিয়াক আহমেদকে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অসুদোপায় অবলম্বনের দায়ে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
আরেকটি ঘটনা যশোর ইসলামীয়া বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের। পরীক্ষায় প্রক্সি দিতে এসে ধরা পড়ায় বেলাল হোসেন খান নামে একজনকে আটক করা হয়।
কেন্দ্র সচিব রেজাউল হক জানান, জাহিদ হাসান নামের এক পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে বেলাল হোসেন পরীক্ষায় অংশ নিতে আসেন। তবে প্রবেশপত্রে থাকা ছবির সঙ্গে পরীক্ষার্থীর চেহারার মিল না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে তাকে আটক করা হয়। বেলাল হোসেনকে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা বলেন, “সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র থেকে আটক ইশতিয়াক আহমেদকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ইসলামীয়া বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রক্সি দিতে আসা বেলাল হোসেন খানের বিরুদ্ধে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের বহু চেষ্টার আরেকটি ঘটনা ধরা পড়েছে টাঙ্গাইলে। এই জেলায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের এক প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের ধরা হয়।
গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা হলেন: সখীপুরের কালমেঘা গ্রামের মৃত আমিনুল ইসলামের ছেলে মো. বেল্লাল হোসেন (৩৩), টাঙ্গাইলের নলশোধা গ্রামের মৃত কুব্বাত আলীর ছেলে জয়নাল আবেদীন (৫২), শহরের আশেকপুর এলাকার মৃত রজব আলীর ছেলেন মো. আনোয়ার হোসেন (৫২), নওগাঁর কামার গ্রামের মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে মো. আল আমিন (২৮), রাজবাড়ী সদরের চরলক্ষীপুর গ্রামের অনন্ত ব্যানার্জীর ছেলে অপূর্ব ব্যানার্জী (৪৩)।
শুক্রবার রাতে র্যাব ১৪-এর ৩ নম্বর কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাওসার বাঁধন তার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর অভিযানে ঢাকায় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য মাববুবকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার মাঝ রাতে সখীপুরের কালমেঘা গ্রামের মো. বেল্লাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আবার বেল্লালের তথ্যের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল শহরের আশেকপুর এলাকার হালিম মিয়ার বহুতল ভবন থেকে তিনজনকে ও নাগরপুরের পাকুটিয়া গ্রাম থেকে অপূর্ব ব্যানার্জিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান মেজর কাওছার বাঁধন। তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক, ষ্ট্যাম্প পেপার, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকের পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও প্রার্থীর মূল সনদপত্রও জব্দ করা হয়।
অভিযুক্তদের মোবাইল থেকে বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে প্রশ্নপত্র এবং চাকরি আদান-প্রদানের কথোপকথনের বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়।
যশোরের মতো গোপালগঞ্জেও প্রাথমিকের পরীক্ষা দিতে এসে অসুদোপায় অবলম্বনের দায়ে তিন পরীক্ষার্থীকে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আরো তিন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ ও গোপালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাদের আটক করে জেল, জরিমানা ও বহিষ্কার করা হয়। এই তথ্য দিয়েছেন গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শোভন সরকার।
সাজাপ্রাপ্তরা হলেন: গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের সেকেন্দার আলী মোল্যার ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম, একই উপজেলার দয়াময় বিশ্বাসের মেয়ে রত্না বিশ্বাস ও মাদারীপুর জেলার কদমবাড়ী গ্রামের সুবল রায়ের মেয়ে বিথিকা রায়।
যশোরে যেমনটি হয়েছে, ডিজিটাল ডিভাইসে নকল করার চেষ্টা; চাঁপাইনবাবগঞ্জেও একই কারণে মোসা. রোকসানা খাতুন নামে এক পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। শুক্রবার বিকালে জেলা শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তাকে আটক করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ঘটনার পরপরই কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দায়িত্বরত পুলিশকে অবহিত করেন। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত রোকসানা খাতুনকে ডিভাইসসহ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটক পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনে মামলা দায়ের প্রক্রিয়া চলমান।
[প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার নিজস্ব প্রতিবেদ ও প্রতিনিধিরা]