আন্তর্জাতিক

বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইরান

তীব্র মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে ইরান। দেশজুড়ে চলমান দমন পীড়নে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে রাজধানী তেহরানের রাস্তাগুলোকে প্রত্যক্ষদর্শীরা ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ সঙ্গে তুলনা করছেন।

তেহরানের এক যুবক বিবিসিকে রবিবার বলেন, “এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের অনেক বন্ধু মারা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালাচ্ছে। রাস্তাজুড়ে রক্ত, ট্রাকে করে মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

তেহরানের কাছে একটি মর্গের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিবিসি প্রায় ১৮০টি মরদেহের ব্যাগ দেখতে পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, দেশজুড়ে অন্তত ৪৯৫ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।

সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে ইরান সহিংস পদ্ধতি ব্যবহার করলে সামরিক হামলার মাধ্যমে সেটির জবাব দেওয়া হবে বলে একাধিকবার হুঁশিয়ার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরান যখন ‘স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে’, তখন যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’। তবে তিনি কী ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি।

গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে ফোনে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে বলে এক খবরে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো হস্তক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলেও রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কড়া সমালোচনা করেছে ইরান।

যেকোনো মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে রবিবার ইরানের পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, “কয়েক লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে” এবং বিক্ষোভের মুখে তারা পিছু হটবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে” বলে মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।

ইরানে শতাধিত শহরে যে বিক্ষোভ চলছে, তাতে যারা অংশ নিবেন, তাদেরকে ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ। এ ধরনের ‘অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ বলেও জানান তিনি।

এমন সতর্কতা ও সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে রবিবারও ইরানের রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা।

বিবিসির যাছাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরান, কেরমানশাহ, বুশেহর, মাশহাদ ও ইলামসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইলামে ইমাম খোমেনি হাসপাতালের দিকেও গুলি ছোড়া হয়েছে বলে ভিডিওতে দেখা যায়।

উত্তরাঞ্চলীয় শহর রাশতের একটি হাসপাতালে এক রাতেই ৭০টি মরদেহ আনা হয় বলে বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত করেছে। তেহরানের এক হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, “অনেক তরুণ মাথা ও বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছে।”

ইরানে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের ইন্টারনেট বন্ধ ২০২২ সালের ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের সময়ের চেয়েও কঠোর।