আন্তর্জাতিক

আইসিজের শুনানিতে গাম্বিয়া: রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করতে চেয়েছিল মিয়ানমার

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার শুনানিতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ‘ভয়াবহ সহিংসতা’ চালিয়েছে মিয়ানমার। 

সোমবার (১২ জানুয়ারি) আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। ইয়াহু নিউজে বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এই এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

শুনানিতে অংশ নিয়ে আইসিজের বিচারকদের উদ্দেশে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাওদা জালো বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক আইনের জটিল কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। এটি বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প এবং একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে নিয়ে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের গল্প এটি। তাদের ধ্বংস করার জন্যই টার্গেট করা হয়েছে।”

২০১৭ সালে মিয়ানমারে চালানো দমন-পীড়নের মাধ্যমে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে গাম্বিয়া এই মামলা করে। আট বছরের আগের ওই গণহত্যা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা; পরে নিপীড়নের মুখে ধাপে ধাপে কয়েক হাজার বাংলাদেশে এসেছে। 

আইন বিশেষজ্ঞরা মামলাটির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছেন। কারণ, এতে ইসরায়েলের গাজায় সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা অনুরূপ মামলায় আদালত কীভাবে অবস্থান নিতে পারে, তার ইঙ্গিত মিলতে পারে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তারা গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়।

জালো বলেন, “তাদের ওপর এমন ভয়াবহ সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা কল্পনাও করা যায় না।”

গাম্বিয়ার পক্ষে আইনজীবী পল রাইখলার আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে ভয়ংকর অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শিশুদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা।

বর্তমানে বাংলাদেশে কক্সবাজারের প্রায় ৮ হাজার একর এলাকায় গড়ে ওঠা জরাজীর্ণ শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

সেখান থেকে ৩৭ বছর বয়সি দুই সন্তানের মা জানিফা বেগম বলেন, “আমরা যে কষ্ট সহ্য করেছি, শুনানিতে তা প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, আমি সেটাই দেখতে চাই।”

তিনি বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার ও শান্তি চাই।”

চূড়ান্ত রায় আসতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে। আইসিজের নিজস্ব কোনো রায় কার্যকর করার ক্ষমতা না থাকলেও গাম্বিয়ার পক্ষে রায় গেলে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ অনেক বেড়ে যাবে।

জালো বলেন, “আমরা হালকাভাবে এই মামলা করিনি।”

তিনি আরো বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অমানবিক ও নিপীড়িত একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো কল্পনাতীত নিষ্ঠুর অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেই আমরা এই মামলা করেছি।”

পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে এই মামলা করে। আইসিজে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করে।

গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, যেকোনো দেশ অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে, যদি তারা মনে করে ওই দেশ সনদ লঙ্ঘন করেছে।

২০১৯ সালে দ্য হেগের পিস প্যালেসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি নিজেই মিয়ানমারের পক্ষে আদালতে হাজির হয়েছিলেন।

তিনি গাম্বিয়ার অভিযোগকে ‘বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ তথ্যের উপস্থাপন’ বলে আখ্যা দেন এবং এটিকে একটি ‘অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত’ বলে দাবি করেন।

মিয়ানমার বরাবরই বলে আসছে, তাদের সেনাবাহিনী তাতমাদাও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দমনে অভিযান চালিয়েছিল। তাদের দাবি, কয়েকটি হামলায় এক ডজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হওয়ার পর এই অভিযান চালানো হয়।

তবে সু চি আর পিস প্যালেসে আসছেন না। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি আটক রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ইয়াহু নিউজে এএফপির বরাত দিয়ে লেখা হয়েছে, সোমবার (১২ জানুয়ারি) মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মুখপাত্রের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

‘শারীরিক ধ্বংস’ ২০২০ সালে আইসিজে নির্দেশ দেয়, মিয়ানমারকে অবশ্যই ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ গণহত্যা সনদে নিষিদ্ধ সব ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে ‘নিজের ক্ষমতার মধ্যে সব ব্যবস্থা’ নিতে হবে।

এর মধ্যে রয়েছে, ‘গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা’ এবং ‘গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে শারীরিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে জীবনযাপনের এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।’

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতা গণহত্যার শামিল। এর তিন বছর আগে জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল জানিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ‘গণহত্যার উদ্দেশ্য’ ছিল।

আইসিজেতে শুনানি শেষ হবে ২৯ জানুয়ারি।

গাম্বিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকারী ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, “আদালত যখন সব প্রমাণ একত্রে বিবেচনা করবে, তখন একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের প্রতিটি স্তরেই গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল।”

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণহত্যা নিয়ে তদন্ত শুধু আইসিজেতেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং সার্বজনীন বিচারিক ক্ষমতার আওতায় আর্জেন্টিনাতেও মামলা চলছে।

আদালতের বাইরে ব্রিটিশ বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের সভাপতি তুন খিন বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় আছি।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা পরিকল্পিত গণহত্যা। আমাদের সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার চেষ্টা। আমরা ন্যায় বিচার চাই। ন্যায় বিচার হলে আমরা আমাদের সব অধিকার নিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরতে চাই। আমরা ক্ষতিপূরণও চাই।”