সারা বাংলা

পেট্রোলে মেশানো হয় পানি-সালফার, জং পড়ে ছিদ্র হচ্ছে বাইকের ট্যাংকি

কালো রঙের মোটরসাইকেলটির ফুয়েল ট্যাংক এখন কেবলই শোভাবর্ধনকারী অনুষঙ্গ। এই মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে পাইপের সাহায্যে জ্বালানি সরবরাহের মূল কাজ করছে ইন্সট্রুমেন্ট কনসোলের ওপর ঝুলিয়ে রাখা একটি সাধারণ প্লাস্টিকের বোতল। 

এমন অদ্ভুত ও বিপজ্জনক দৃশ্যের দেখা মিলেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি এলাকায়। নিম্নমানের জ্বালানি তেলের কারণে মোটরসাইকেলের ট্যাংক ফুটো হয়ে যাওয়ায় এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করার কথা জানিয়েছেন মোটরসাইকেলটির মালিক আতিম মাহমুদ।

তিনি অভিযোগ করেন, দুই বছর আগে অনেক শখ করে মোটরসাইকেলটি কিনেছিলেন। নিম্নমানের তেলের মাশুল দিতে হচ্ছে তাকে। তেলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তার বাইকের ট্যাংকটি ভেতর থেকে ক্ষয়ে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। 

আতিম মাহমুদ তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলেন, “ভেজাল তেলের কারণে ট্যাংকের ক্ষতি হয়েছে। মোটরসাইকেলের ট্যাংক বদলাতে অনেক টাকা দরকার। বর্তমান বাজারে সেই সামর্থ্য আমার নেই। তাই আপাতত বাধ্য হয়ে ট্যাংকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মোটরসাইকেলের সামনের ইন্সট্রুমেন্ট কনসোলের ওপর একটি প্লাস্টিকের বোতলে তেল রেখে সেটার মাধ্যমে ইঞ্জিনে তেল দিচ্ছি। এভাবে গাড়ি চালানো যে কতটা বিপজ্জনক তা আমি জানি, কিন্তু উপায় নেই।”

কেবল আতিম মাহমুদই নন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে এখন শত শত মোটরসাইকেল মালিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের অভিযোগ, পেট্রোল পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা জ্বালানিতে অতিরিক্ত সালফার বা পানি মেশানো থাকছে। ফলে ট্যাংকের ভেতরের ধাতব স্তর দ্রুত নরম হয়ে মরিচা ধরছে এবং অল্প দিনেই তা ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মোটরসাইকেলের দামি ইঞ্জিন।

গোমস্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা রেজাউল করিমের অভিযোগ, “তেলে অতিরিক্ত সালফার আর পানির কারণে মাত্র কয়েক মাসেই মোটরসাইকেলের ট্যাংকের ভেতরে মরিচা ধরে তলা ফুটো হয়ে গেছে। মেকানিক জানিয়েছে, এই অ্যাসিডিক জ্বালানি শুধু ট্যাংক নয়, ইঞ্জিনের দামি পার্টসগুলোও নষ্ট করে দিচ্ছে। পাম্প থেকে তেল নেওয়ার পর এখন মোটরসাইকেল আগের মতো শক্তি পায় না, শব্দও বদলে গেছে।”

মোটরসাইকেলের ট্যাংকের ভেতরে মরিচা

তিনি বলেন, “আমরা টাকা দিয়ে জ্বালানি কিনি, কিন্তু বিনিময়ে পাচ্ছি ইঞ্জিনের স্থায়ী ক্ষতি। জ্বালানির মান নিয়ন্ত্রণ করা না হলে আমাদের মতো সাধারণ চালকদের বিপাকে পড়তে হবে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুরের ব্যাংক কর্মকর্তা কায়েম আলী জানান, ব্যাংকে যাতায়াতের জন্য কেনা তার মোটরসাইকেলটির ট্যাংক দিয়ে কয়েকদিন ধরে তেল চুইয়ে পড়ছিল। প্রতিদিনের এই যন্ত্রণাদায়ক ঝুঁকি এড়াতে শেষ পর্যন্ত পুরো ট্যাংকটিই পরিবর্তন করতে হয়েছে। 

একই এলাকার ঠিকাদার মো. ওয়ালিদ আহম্মেদ পেশাগত প্রয়োজনে তিনটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। সম্প্রতি তিনটিরই ট্যাংক ছিদ্র হয়ে গেছে। এর মধ্যে দুটি মোটরসাইকেল প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে আছে, তৃতীয়টি কোনোমতে ব্যবহার করছেন তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিশ্বরোড এলাকার মোটরসাইকেল মেকানিক আব্দুর রহিম বলেন, “জ্বালানি তেলে বেশি সালফার মেশালেই ইঞ্জিনের ভেতরে অ্যাসিড তৈরি হয়। এই অ্যাসিড পিস্টন, ট্যাংকি আর বিয়ারিং দ্রুত ক্ষয় করে ফেলে। এছাড়া, এটা ইঞ্জিন অয়েলের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, ফলে ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয় এবং সাইলেন্সারেও মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে যায়।”

সুমন আলী নামে আরেক মোটরসাইকেল মেকানিক বলেন, “তেলে বেশি পরিমাণে পানি মেশানো থাকলে বাইক সহজে স্টার্ট হতে চায় না, চলন্ত অবস্থায় ঝটকা দেয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ফুয়েল ট্যাংকে। নিচে পানি জমে তলা ফুটো হয়ে যায়। এগুলো ঠিক করতে অনেক খরচ হয়।”

মোটরসাইকেল মালিকদের এমন ভোগান্তির দায় নিতে নারাজ পেট্রোল পাম্প মালিকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফ হোসেন আলিম বলেন, “তেলের মান খারাপের বিষয়ে আমরা ডিপোতে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানিয়েছি। আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার মেলেনি। পাম্প মালিক হিসেবে আমাদের আসলে কিছু করার নেই, কারণ আমরা ডিপো থেকে যে তেল পাই, গ্রাহকের কাছে সেটাই সরবরাহ করি।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান হক বলেন, “মোটরসাইকেলের ট্যাংক এভাবে নষ্ট হওয়ার খবরটি আমরা শুনেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার পর দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”