আন্তর্জাতিক

চার দশক ক্ষমতায় থাকার পর সপ্তম মেয়াদে লড়ছেন উগান্ডার প্রেসিডেন্ট

উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনি যখন ১৯৮৬ সালে প্রথম দেশটির ক্ষমতায় বসেন তখন তিনি বলেছিলেন, “সামগ্রিকভাবে আফ্রিকার এবং বিশেষ করে উগান্ডার সমস্যা জনগণ নয়, বরং সেইসব নেতারা যারা ক্ষমতায় অতিরিক্ত সময় থাকতে চান।”

তবে ৮১ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট ও সাবেক বিদ্রোহী নেতা আগামী বৃহস্পতিবার সপ্তম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়ছেন। প্রায় চার দশক ধরে তিনি এই পূর্ব আফ্রিকান দেশটি শাসন করছেন, যার ফলে দেশটির বেশিরভাগ নাগরিক তাদের জীবনে তিনি ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট দেখেনি।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, উগান্ডার স্বৈরাচারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার পর একরাশ আশার ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন মুসেভেনি। কিন্তু সেই সদিচ্ছা দ্রুতই দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদের অভিযোগের নিচে চাপা পড়ে যায়।

অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফ টিটেকা রয়টার্সকে বলেন, “শুরু থেকেই তার শাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুর্নীতি।”

মুসেভেনি তার প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তিনি দাবি করেন, যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের সবার বিচার করা হয়েছে।

১৯৮৬ সালে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই মুসেভেনি পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা অগ্রাধিকারগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিদেশি মিত্র তৈরি করেছেন। তিনি সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করেছেন ও উগান্ডায় বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছেন।

কিন্তু তার দীর্ঘ শাসনামল বিতর্কিত। একদিকে যেমন এইডস মহামারি মোকাবিলা ও উগান্ডাবাসীর ওপর ২০ বছর ধরে নির্যাতন চালানো ‘লর্ডস রেজিস্ট্যান্স আর্মি’ নামক বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দমনে তার সরকার প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তার সরকার সমালোচিত।  

ক্ষমতার পথ

খ্রিস্টান যাযাবর পশুপালক পরিবারে জন্ম নেওয়া মুসেভেনি একটি অভিজাত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশী তানজানিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে এসে স্বৈরাচারবিরোধী বড় একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন, যা শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করে। এরপর ১৯৮০ সালে মিল্টন ওবোতে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হন।

১৯৮৫ সালে এক অভ্যুত্থানে ওবোতে ক্ষমতাচ্যুত হন। পরের বছর মুসেভেনির ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ পার্টির সামরিক শাখা টিটো ওকেলোকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে।

১৯৮৬ সালে প্রথমবার উগান্ডার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় মুসেভেনি বলেছিলেন, “এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এটি আমাদের দেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন।”

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তার প্রচেষ্টা শুরুতে পশ্চিমা দেশগুলো সাধুবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু উগান্ডার অর্থনীতি চাঙা হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির কারণে জনরোষও বাড়তে থাকে।

সংসদীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বেসরকারিকরণ কর্মসূচির অধীনে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মুসেভেনির আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠদের কাছে পানির দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল এবং বিক্রির অর্থের একটি অংশ তছরুপ করা হয়েছিল।

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ

মুসেভেনি এ পর্যন্ত লড়া ছয়টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সবকটিতেই জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে চারবারই তিনি কিজা বেসিগ্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন। ৮০’র দশকে মুসেভেনি যখন বিদ্রোহী নেতা ছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত ছিলেন বেসিগ্যে। পরবর্তীতে তিনি মুসেভেনির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন ও তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বেসিগ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারে রয়েছেন।

২০০৫ সালে উগান্ডার পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদের সীমাবদ্ধতা তুলে দেয়। সমালোচকরা বলছেন, মুসেভেনিকে আজীবন ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ও পুলিশ বিরোধী সমর্থকদের মিছিলে কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছে।

২০০৬ সালে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে মুসেভেনি বলেছিলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি আমাদের ওপর আস্থা হারিয়ে থাকে, তাহলে সেটি একটি প্রশংসা, কারণ তারা সচরাচর ভুলই করে থাকে।”

পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি চীন, রাশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। উগান্ডায় বিশাল তেলের খনি আবিষ্কৃত হওয়ায় তার অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে, যার ফলে টোটালএনার্জি ও সিএনওওসি-এর মতো জ্বালানি জায়ান্টদের সঙ্গে রপ্তানি পাইপলাইন নির্মাণের চুক্তি হয়েছে।

উত্তরসূরি নিয়ে উদ্বেগ

আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে মুসেভেনির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ৪৩ বছর বয়সী পপ তারকা ববি ওয়াইন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মুসেভেনির জয় প্রায় নিশ্চিত হলেও সামনের পথ অনিশ্চিত। প্রেসিডেন্ট ইদানীং বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার লক্ষণ দেখাচ্ছেন।

মুসেভেনির ছেলে ও উগান্ডার সামরিক বাহিনীর প্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবার দ্রুত উত্থানের দিকে ইঙ্গিত করে অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিটেকা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “এই নির্বাচনের ওপর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো- তার উত্তরসূরি কে হবেন?”

উগান্ডার বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, মুসেভেনি তার ছেলেকে উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করতে তার সামরিক ক্যারিয়ারকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছেন। অথচ ৫১ বছর বয়সী কাইনেরুগাবা প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেন এবং মুসেভেনির পুরোনো বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মীদের একঘরে করে দেওয়া হয়েছে।

দেশটির প্রখ্যাত সাংবাদিক চার্লস ওনিয়াঙ্গো-ওবোর মতে, নির্বাচনের ফলাফল মুসেভেনির পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। ফলাফল খুব একটা আশানুরূপ না হলে তিনি দলের অন্যান্য সদস্যদের পদোন্নতি দিতে পারেন যাতে পারিবারিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সমালোচনা এড়ানো যায়।

তিনি আরো বলেন, “মুসেভেনি শারীরিকভাবে এখন আগের চেয়ে দুর্বল, কিন্তু তিনি খুব কঠোর পরিশ্রমী... তাকে যদি হাঁটার লাঠিও ব্যবহার করতে হয়, তবুও তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।”