পজিটিভ বাংলাদেশ

৪৫০ বছরের বরমী হাট, মিলছে নিরাপদ শাকসবজি 

ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই একের পর এক নৌকা ভিড়ছে শীতলক্ষ্যার তীরে। নৌকার পেট বোঝাই আলু, টমেটো, শিম, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলাসহ দেশিয় সবজি। নদীর শান্ত জল ছুঁয়ে বরমী বাজার ঘাটে নৌকা ভিড়তেই ব্যস্ততার শুরু। কেউ নৌকা থেকে সবজি নামাচ্ছেন, কেউ এগিয়ে গিয়ে দরদাম করছেন, কেউ হিসাব রাখছেন। আড়তের সামনে পাইকারদের ভিড় আরো বেশি। 

বুধবার (১৫ জানুয়ারি) সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারে গিয়ে চোখে পড়ে চিরচেনা এই দৃশ্য।

সবজির এই হাটের বয়স প্রায় ৪৫০ বছর। বসে সপ্তাহের প্রতি বুধবার সকালে। হাটটি শুধু স্থানীয়দের নয়, আশপাশের উপজেলা ও জেলার কৃষকদেরও ভরসার জায়গা এটি। কারণ তারা জানেন, আর কোথায় সবজি বিক্রি করতে না পারলে এই হাটে একটা ব্যবস্থা হবেই। যে কারণে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কৃষকেরা নৌকা কিংবা অন্য উপায়ে তাদের উৎপাদিত শাকসবজি নিয়ে হাটে হাজির হন। সকাল ৯টার মধ্যেই এখানে বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়।

আড়তদারেরা জানান, হাটের দিন কয়েক লাখ টাকার শাকসবজি কেনাবেচা হয়। হাটের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো—শাকসবজি বিক্রি করতে কৃষকদের খাজনা বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয় না। 

পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও উপজেলার কৃষক ইয়াসিন বলেন, ‘‘নিজের জমির আলু আর টমেটো নিয়ে প্রতি বছরই এখানে আসি। এবার শাকসবজির দাম ভালো পাচ্ছি। তবে ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতের কারণে ফলন কিছুটা কম। এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার শাকসবজি বিক্রি করেছি।’’

একই কথা বললেন কৃষক মোফাজ্জল হোসেন। তিনি জানান, শীতলক্ষ্যার তীরে হাট বসায় আমাদের অনেক সুবিধা। বাড়ির কাছের ঘাট থেকেই নৌকায় শাকসবজি নিয়ে আসি। কোনো খাজনা নেই, ঝামেলাও কম। পাইকারেরা নিজেরাই এসে দামদর করে নিয়ে যায়। তাছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনও এখানে সবজি বিক্রির সুযোগ আছে। 

শাকসবজির এই হাটের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য এখানে টাটকা সবজি পাওয়া যায় এবং অধিকাংশই চাষ করা হয় নিরাপদ সবজি চাষের নিয়ম মেনে। কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের জমিতে ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। আমরা জৈব সার ব্যবহার করি। তাই শাকসবজি টাটকা ও নিরাপদ।’’

শীতলক্ষ্যার তীরে আড়ত বসিয়েছেন আব্দুল কাদির। তিনি বলেন, ‘‘বুধবার সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয়। দুই ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক লাখ টাকার শাকসবজি বিক্রি হয়ে যায়। নদীর তীরে হওয়ায় মাল ওঠানামা করা সহজ। এখানকার শাকসবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।’’

হাটের ইজারাদার আব্দুল মতিন জানান, শীত মৌসুমে প্রায় দুই মাস নদীর তীরে বিনা খাজনায় শাকসবজি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়। এতে কৃষকেরা সরাসরি লাভবান হন। এবারও সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’’

বরমীর খ্যাতি শুধু কৃষিকাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারেরা সবজি কিনতে নিয়মিত এখানে আসেন। জৈনাবাজার থেকে আসা এক পাইকার বলেন, ‘‘টাটকা শাকসবজি কিনতে প্রতি বুধবার বরমী বাজারে আসি। এখানের আলু, টমেটো, শিম খুব ভালো মানের। দাম তুলনামূলক কম, স্বাদও ভালো। তাই এখান থেকে কিনে ঢাকায় বিক্রি করি।’’

শীতের ভোরের কুয়াশা, শান্ত স্বচ্ছ নদী আর নৌকার এই সম্মিলনই বরমী বাজারের আলাদা সৌন্দর্য। শতাব্দীপ্রাচীন এই হাট আজও প্রমাণ করে, নদী ঘিরে কৃষক, পাইকার আর ভোক্তার সম্পর্ক কতটা অর্থবহ হতে পারে।