সারা বাংলা

কেরানীগঞ্জে অবৈধ ইটভাটার দাপট, হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তেগুড়িয়া ও কোন্ডা ইউনিয়নে পরিবেশ অধিদপ্তরের আইনকে তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত এসব ইটভাটা আশপাশের পরিবেশ, কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ও তেগুরিয়া ইউনিয়নে গিয়ে জানা যায়, বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমির একেবারে কাছেই অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। নির্ধারিত চিমনি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় এসব ভাটা থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া। এতে আশপাশের এলাকার বাতাস দূষিত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও চোখের নানা সমস্যায় ভুগছেন। দিনের পর দিন ধোঁয়ার মধ্যে বসবাস করায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় ঘরের ভেতরেও ধোঁয়া ঢুকে পড়ছে বলে জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কৃষক বলেন, “ইটভাটার কাঁচামাল সংগ্রহের নামে নির্বিচারে ফসলি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এই উর্বর মাটিই কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি। বছরের পর বছর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া এই মাটি একবার কেটে নেওয়া হলে তা সহজে আর ফিরে আসে না। এর ফলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, ফসল ফলাতে বাড়ছে খরচ, অথচ কমছে ফলন। এতে করে কৃষকরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কৃষক বলেন, “যদি এখনই ইটভাটার জন্য ফসলি জমির মাটি কাটার মতো অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম বন্ধ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে এবং পরিবেশ বিপর্যয় আরো ভয়াবহ রূপ নেবে। তাই আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি,ফসলি জমি রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে। দেশের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। এই সত্য অনুধাবন করেই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোন্ডা ইউনিয়নের এক  বাসিন্দা বলেন, “প্রশাসনের অভিযান চললেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অনেক অবৈধ ইটভাটা কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো চালু হয়ে যায়। এতে করে প্রশাসনিক উদ্যোগের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষার উদ্দেশ্য বার বার ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।“ তারা দ্রুত অভিযান জোরদার করে অবৈধ ইটভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোন্ডা ইউনিয়নের আরেক বাসিন্দা জানান, কেরানীগঞ্জে ইটভাটা পরিচালনাকারীরা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। তাদের প্রভাবের কাছে সবাই অসহায়। বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালিত হলেও নেই কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ লাইসেন্স। তবুও পরিবেশ দূষণকারী এসব ইটভাটা দিবানিশি নির্বিঘ্নে চালু রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, “অবৈধ ইটভাটার কারণে আমাদের কৃষিজমির উর্বরতা দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এসব ইটভাটার প্রভাবে আশপাশের বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জলাশয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইটভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশকে দূষিত করার পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিষয়টি শুধু পরিবেশগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় ও ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও)  মো: উমর ফারুক বলেন, “পরিবেশ দূর্ষণ করে এমন কোন কারখানা কেরানীগঞ্জে চলতে পারবে না। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত অবৈধ ইটভাটা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শুধু অবৈধ ইটভাটাই নয়, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের মাধ্যমে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও উপজেলা প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে খুব দ্রুত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে এবং এই অভিযান ভবিষ্যতেও আরো জোরদার করা হবে। কোনো অবৈধ ইটভাটা বা পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবে না।”