সারা বাংলা

সাগরের অন্তিম যাত্রায় অথৈ সাগরে পরিবার

ঋণ করে কেনা ইজিবাইকটি ছিল সাগর বেপারির ছোট ছোট দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে জীবন-জীবিকা সচল রাখার একমাত্র অবলম্বন। সাগরও নেই, ইজিবাইকও নেই; অথচ থেকে গেছে নগদ কিস্তি পরিশোধের দায়। এখন কীভাবে চলবে জীবন-সংসার, সন্তানদের মুখে কীভাবে দুবেলা উঠবে দুমুঠো ভাত, আর কীভাবেইবা শোধ হবে কিস্তি; সেই দুঃসহ চিন্তা অথৈ সাগরে ফেলেছে সাগরের স্ত্রী মাহফুজা বেগমকে।

রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় দানব হয়ে আসা একটি বাস মাদারীপুর সড়কে মাফুজা বেগম ও তার সন্তানদের জীবনে ‘কু ডাক’ দিয়ে যায়। সেই ডাক পৌঁছাতে সন্ধ্যাটি বিষাদসিন্ধুতে রূপ নেয় পরিবারটির জন্য। 

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাসের চালক সাগর বেপারির ইজিবাইকটি চাপা দেয়। আর তাতে সমাপ্ত হয় সাতটি জীবনের অসামপ্ত গল্প। সাগর বেপারি নিহত ওই সাতজনের একজন। সেটিই ছিল আয়ের উদ্দেশে রাস্তায় বের হওয়া সাগরের শেষযাত্রা, যা জীবনযাত্রার শেষবিন্দুতে পরিণত হয়। 

ঘটকচরে সড়কে নিহত আরেকজনের বাড়িও মাদারীপুরে; বাকি পাঁচজন গোপালগঞ্জের বাসিন্দা, যারা ঢাকায় পোশাকশ্রমিকের কাজ করতেন। 

মাদারীপুর সদরের কুনিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জসিম বেপারির ছেলে সাগর বেপারি। ঘটকচর এলাকার একটি গুচ্ছগ্রামে স্ত্রী, সাত বছরের ছেলে আব্দুল্লাহ ও তিন বছরের ছেলে ইউসুফকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগর আগে ভ্যান চালাতেন। ভ্যানে যাত্রীসংকট দেখা দিলে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে ইজিবাইক কিনে কোনোমতে সংসারের চাকা ঘোরাচ্ছিলেন। একটু একটু করে টাকা জমিয়ে ছোট দুই সন্তানকে পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন দেখছিলেন। সব স্বপ্ন এক ‘দানব’ বাসের ধাক্কায় চুরমার হয়ে মিশে যায় পিচঢালা সড়কে। 

সাগরের বাবা জসিম বেপারির সঙ্গে রাইজিংবিডি ডটকমের কথা হয়। বড় দুঃখ ভরা মনে তিনি বলেন, “সাগর ঋণের প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে একটি ইজিবাইক কিনেছিল। সব কিস্তি এখনো শোধ হয়নি। ছেলেটা চলে যাওয়ার পর পরিবার নিয়ে আমরা দিশেহারা।”

রেহেনা বেগম সাগরের ফুফু। কথা হলে তিনি বলেন, “সাগর খুবই ভদ্র ও শান্ত ছিল। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না। এত অল্পবয়সে এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় চলে যাবে, ভাবতেই পারিনি।”

দুশ্চিন্তায় নুইয়ে পড়েছেন মাহফুজা বেগম। তার যেন কথা বলার শক্তিটুকু নেই। সাগরের স্মৃতি হাতড়ে মলিন কণ্ঠে তিনি বললেন, “সংসার চালানোর জন্য কিস্তিতে ইজিবাইক কিনেছিল (সাগর)। স্বামী নেই, আয় নেই; আছে ঋণের বোঝা। আর আছে আমার দুটি ছোট ছেলে। আমি কীভাবে বাঁচব, বুঝতে পারছি না।”

সড়ক-মহাসড়কে ছোট ছোট যাত্রাবাহী যানবাহনে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, আর তৈরি হচ্ছে একেকটি দুঃস্বপ্নের গল্প। ইজিবাইক বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি ও থ্রি হুইলার ধরনের যানবাহন দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সড়কে ৭৯৫ জন নিহত হন। ২০২৫ সালের ওই একই সময়ে বাসসহ অন্যান্য যানবাহন মিলে ১৭ হাজার ৯৫৭টি দুর্ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৭৮ জন নিহত ও ১৭ হাজার ৮২৬ জন আহত হন। 

গত বছরের শেষ ছয় মাসের হিসাব পেলে দেখা যাবে সাগর বেপারির মতো আরো কত জীবন থেমে গেছে সড়কে; তাদের কবরে সবুজ ঘাস জন্মেছে হয়তো। আর বেঁচে থাকা নিয়ে অথৈ অনিশ্চিয়তায় ডুবে গেছে হাজারো পরিবার।