ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাতক্ষীরায় জমে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। নতুন আসন বিন্যাসের পর জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচারে নেমেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মাঠে অনুপস্থিতির ফলে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ এবং জামায়াতের সুসংগঠিত মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি- এই দুই বাস্তবতায় সাতক্ষীরার চারটি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর দুর্গ হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরার সবকটি আসন বিএনপি ফিরে পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
সাতটি উপজেলা, আটটি থানা, তিনটি পৌরসভা ও ৭৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই জেলায় চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ জন। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তাই সাতক্ষীরায় ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো সংকট।
সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনে প্রার্থী হতে মোট ২৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই ও আপিল শেষে বর্তমানে বৈধ প্রার্থী ২০ জন।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে পাঁচ জন, সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে সাত জন, সাতক্ষীরা-৩ (কালিগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে পাঁচ জন ও সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে তিন জন। সব আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে।
সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ না থাকায় দলটি অনেক আগেই চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে নামেন তারা।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর একাধিক আসনে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে নানা কর্মসূচি হয়। পরে হাইকমান্ডের নির্দেশে সেই বিভেদ মিটলেও একটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির এক নেতা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের সাতক্ষীরার পাঁচটি আসনের মধ্যে চরেটিতে জামায়াত ও একটিতে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালে জামায়াত সদর আসনে জয় পায়। বাকি চারটি যায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দখলে।
২০০১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসনে জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনেই প্রথম সাতক্ষীরা-১ আসনে জয় পায় বিএনপি। ২০০৮ সালে আসন সংখ্যা কমে চারটি হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত একটি আসনও পায়নি।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, “গত ১৬ বছরে তালা ও কলরোয়ায় ব্রিজ, রাস্তা-ঘাটসহ অবকাঠামগত কোনো উন্নয়ন না হওয়াই জনগণ এবার আমাকে পেয়ে আমার কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে।”
তিনি আরো বলেন, “আমি নির্বাচিত হলে এলাকার জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক পাটকেলঘাটা থানাকে উপজেলায় রূপান্তর ও তালাকে পৌরসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তালা ও কলারোয়ায় সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নের পরিকল্পনা করবেন তিনি।
একই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, “নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ও তার দল সাধারণ মানুষের পাশে ছিল। নির্বাচিত হলে স্থানীয় মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন।”
বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি বাকি তিনজন প্রার্থী হলেন- বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় এনজিও বিষয়ক সম্পাদক জিয়াউর রহমান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাটকেলঘাটা থানা শাখার সভাপতি শেখ মো. রেজাউল করিম। তবে এলাকায় তাদের প্রচার প্রচার তেমন দেখা যাচ্ছে না।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মো. আবদুর রউফকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর আসনটিতে বিরোধ দেখা দেয়। মনোনয়ন না পেয়ে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম ও জেলা কমিটির বর্তমান যুগ্ম-আহ্বায়ক তাসকিন আহমেদ চিশতি সমর্থকরা আন্দোলনে নামেন। পরে আব্দুর রউফ সবার মান ভাঙিয়ে নির্বাচনের এক টেবিলে বসিয়ে তার পক্ষে কাজ করার জন্য একত্র হয়ে মাঠে নামান।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রউফ বলেন, “সাধারণ ভোটাররা আমাকে পছন্দ করেন, ভালোবাসেন। সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রশ্নে বিএনপির সবাই এখন এক। সাতক্ষীরায় বিএনপি এখন খুব শক্তিশালী। আমি পাস করলে জনগণের পাশে থাকব সবসময়। জনগণের সব চাওয়াকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অতি পরিচিত একজন মুখ। তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের তার ও তার দলের ওপর আস্থা রয়েছে। বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনগুলোতে মানুষের আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। এলাকার উন্নয়নের জন্য আমরা বদ্ধপরিকার।”
এ আসনে জাতীয় পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক, সাবেক এমপি মো. আশরাফুজ্জামান আশু, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির জেলার সাধারণ সম্পাদক জি এম সালাউদ্দীন, বাংলাদেশ জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার উপদেষ্টা রবিউল ইসলাম ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জেলা শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম (সাহেদ)।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে জেলার এই একটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি দলের এক নেতাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য শহিদুল আলম।
এ বিষয়ে শহিদুল আলম বলেন, “আমার দলীয় মনোনয়নের জন্য এ আসনের দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মাঠে নেমেছিলেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না দেওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবির মুখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।”
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ-আশাশুনি) আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন বলেন, “দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্য কেউ প্রার্থী হতে চাইলে দল থেকে তার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। আমি বিশ্বাস করি, দুঃসময়ে আমি এবং দল সাধারণ ভোটারদের পাশে ছিলাম।”
তিনি আরো বলেন, “তারা আমাকে ও দলকে মূল্যায়ন করবেন। পাশ করলে সাধারণ জনগণের চাওয়া পাওয়া ও গুরুত্বকে সবসময় প্রাধান্য দেব।”
একই আসনে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, শহিদুল আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যা জামায়াতের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী দলের জেলা শাখার সাবেক আমির মুহা. রবিউল বাসার জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে বলেন, “ভোটাররা সৎ মানুষকে পছন্দ করেন ও আস্থা রাখেন। আমি সবসময় সাধারণ জনগণের চাওয়া পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি।”
এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মো. আলিফ হোসেন ও বাংলাদেশ মাইনরটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সদস্য রুবেল হোসেন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ড. মনিরুজ্জামান মনির এবং জামায়াতের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন।
সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে শ্যামনগর অংশের প্রার্থীরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে আসনটিতে তিনজন বৈধ প্রার্থী আছেন।
তারা হলেন- জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান, জামায়াতের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এস এম মোস্তফা আল মামুন।
ভোটাররা বলছেন, নতুন মুখ হলেও প্রবাসী মনিরুজ্জামান প্রচারের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অপর দিকে জামায়াতের জি এম নজরুল ইসলাম দুবারের সংসদ সদস্য হওয়ায় তার নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “আমি পাঁচ বছর ধরে জনসাধারণের ভালোমন্দে পাশে থাকার পাশাপাশি শ্যামনগর উন্নয়নে, বিশেষ করে তরুণসমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছি।”
জামায়াতের প্রার্থী জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্যে আমরা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম। ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করব। ভোটারদের আমার প্রতি আস্থা রয়েছে। তারা সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নেবে।”
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহবায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, “দীর্ঘ নির্যাতনের পরও আমাদের নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে ছিলেন। আমরা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। সবাই স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ভোট দিয়ে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই বিএনপিকে জয়ী করবে বলে বিশ্বাস করি।”
অপরদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়ে বলেন, “কঠিন দিনগুলোতেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি আমরা। এবারও চারটি আসনেই বিজয়ী হব।”