নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংবেদনশীল স্থান হাজতখানার ভেতরে পরিবারসহ দুই শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার ‘বেয়াইখানার’ (বর ও কনের বাবাকে আপ্যায়ন করানো) আয়োজন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে শাস্তি হিসেবে বদলী করা হয়েছে। এছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার দুপুরে (২১ জানুয়ারি) জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন অভিযুক্তদের বদলি ও তদন্ত কমিটির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে নারী হাজতখানার ভেতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের সহযোগিতায় এ ঘটনা ঘটে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আজম পাশা চৌধুরী রুমেল এবং হাতিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদ দীর্ঘদিন হত্যা-বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে নোয়াখালী জেলা কারাগারে রয়েছেন। সম্প্রতি জেলখানায় দুই নেতার কথাবার্তার পর কোম্পানীগঞ্জের যুবলীগ নেতা আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থিকে হাতিয়া আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবের সঙ্গে বিয়ে দেন। গত ৩০ ডিসেম্বর পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
গত সোমবার দুই নেতাকে মামলায় হাজিরা দেওয়ার জন্য আদালতে নিলে পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের পরিবারের সদস্যরা হাজতখানার মধ্যে বেয়াইখানার আয়োজন করেন। সেসময় নারী আসামিদের জন্য সংরক্ষিত ওই হাজতে আজম পাশা রুমেলের স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি, মেয়ে ফালিহা আজম চৌধুরী অর্থি এবং অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাকিবসহ আরো এক যুবক উপস্থিত ছিলেন।
হাজতখানার ঘটনাটি জানার জন্য আজম পাশা চৌধুরীর স্ত্রী খোদেজা আক্তার সুমি এবং অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের ছেলে ছাইম উদ্দিন সাবিককে বারবার ফোন দিলেও তারা পোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠালেও তারা কোনো উত্তর দেননি।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজম পাশা চৌধুরী রুমেলের বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাত কর্মীকে গুলি করে হত্যাসহ বিভিন্ন থানায় আরো একাধিক মামলা চলমান। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট ছাইফ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে হাতিয়া, চরজব্বর ও কবিরহাট থানায় বিস্ফোরকসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে।
নারী হাজতখানার ভেতরে সুরক্ষিত ওই কক্ষটি নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাক পরিবর্তন, খাওয়া, নামাজসহ নারী আসামিদের বাচ্চাদের দুগ্ধপানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন সোমবার (১৯ জানুয়ারি) পুলিশের সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) জাহেদুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই হাজতখানার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী শহর উপ-পরিদর্শক (এটিএসআই) কবির আহম্মদ ভুইয়া, কনস্টেবল বিল্লাল হোসেন (নম্বর ৬৩৬), মো. হাসান (৩৪০) ও সাইফুল ইসলাম (২২০)।
বেয়াইখানার বিষয়ে এটিএসআই জাহেদুল ইসলাম বলেন, “চিফ জুডিসিয়াল ও জজ আদালতের দুই হাজতখানায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের ডিউটি বণ্টন করে আমি ওইসময় আদালতের কাজে ওপরে ছিলাম। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
আদালতের পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) মো. সারওয়ার আলম বলেন, “ঘটনাটি জানার পর আমি সবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো অনিয়ম আদালত পাড়ায় না হয়, সেজন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, “আদালতের নারীদের সুরক্ষিত স্থানে আসামি ছাড়া কারো যাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) লিয়াকত আকবর ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. শাহ আলম। আগামী সাত কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
তিনি জানান, এছাড়া অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে হাতিয়া থানার বিভিন্ন পানিতে বদলি করা হয়েছে।