রাজনীতি

প্রচারের প্রথম দিনে কঠিন কথার লড়াই, ‘দম’ দেখালেন তারেক রহমান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচারের প্রথম দিনই দলীয় শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে মাঠে নামে প্রার্থীরা। এ দিন আলোচনায় ছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটানা সাত জেলায় নির্বাচনি জনসভায় অংশ নেওয়ার বিরল ঘটনা বিশেষভাবে মনোযোগ কেড়েছে।

জামায়াতে ইসলামীকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য আক্রমণ করে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে সিলেট থেকে ভোটের প্রচার শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই ধারা বজায় রাখেন বিএনপির অন্য প্রার্থীরাও। তবে পাল্টা আক্রমণ শানাতে ছাড়েনি জামায়াত ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের শরিকরা, বিশেষ করে এনসিপি। 

শীর্ষ নেতাদের প্রচার বেশি নজর কাড়লেও সারা দেশে রাজপথে, শহরে-গ্রামে ভোটের প্রচারে নেমে প্রার্থীরা যেমন পরস্পরকে টার্গেট করে বক্তব্য দিয়েছেন, তেমনি হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনাও করেছেন।

বিশেষ ব্যক্তির দোয়া নেওয়া, মাজার জিয়ারত বা বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রার্থীদের প্রচার শুরু করতে দেখা গেছে। প্রচারের প্রথম দিন ব্যতিক্রম ছিল গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাবিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করার ঘটনা।

কিছু সংঘাতের ঘটনা ছাড়া প্রচারের বৃহস্পতিবার প্রথম দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামগ্রিকভাবে ‘ভালো মনোভাব’ লক্ষ্য করা গেছে বলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) মন্তব্য করেছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলো আচরণবিধি প্রতিপালনে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। মিরপুরে জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে আগের দিনের একটি গোলযোগের ঘটনা ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অসহনীয় পরিস্থিতি দেখা যায়নি।

ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় শীর্ষ নেতাদের প্রচারের প্রসঙ্গ টেনে এই কমিশনার বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, প্রচারে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভালো সংস্কৃতি ও সহনশীল মনোভাব দেখা যাচ্ছে। কেউ কারো প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেবেন না- এমন সিদ্ধান্ত দলগতভাবে নেওয়া হয়েছে। টুকটাক ঘটনা ঘটলেও আমরা আশা করি, সবাই মিলে একটি সুন্দর নির্বাচন করতে পারব।”

সব দল ও প্রার্থী আইন ও বিধি মেনে চলবেন, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ইসি মাছউদ।

সাধারণ ছুটি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি এবং তার আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠন করেছে বিশেষ সমন্বয় সেল। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, এবার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কমপক্ষে পাঁচজন অস্ত্রধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

এর মধ্যে অন্তত দুইজন অস্ত্রধারী পুলিশ ও তিনজন অস্ত্রধারী আনসার সদস্য থাকবেন। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ছয়জন অস্ত্রধারী সদস্য মোতায়েন থাকবে। তার ভাষায়, “ফলে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের কোনো সুযোগ থাকবে না।”

তারেক রহমানের সকাল শুরু সিলেটে, নারায়ণগঞ্জে শেষ ভোরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। ভোট ও গণভোট নেওয়া হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

ভোটের প্রচার শুরুর আগের দিন বুধবার রাতে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় বক্তব্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন তিনি। তার আগে সকালে তরুণদের নিয়ে ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শিরোনামে আলোচনায় অংশ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এতে সিলেটের ১৯টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজনৈতিক শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

সকালে সিলেট থেকে শুরু হয়ে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদীর পর সপ্তম জেলা হিসেবে তারেক রহমান যখন নারায়ণগঞ্জের জনসভা শেষ করেন তখন আরেকটি ভোর হয়ে যায়। শুক্রবার সোয়া ৪টার দিকে নারায়ণগঞ্জের জনসভা থেকে ঢাকার গুলাশানের বাসভবনের দিকে রওনা দেন তিনি। 

সাত জেলার নির্বাচনি জনসভায় বিএনপির নেতাকর্মীসহ লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। এসব জনসভায় মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং দলটির বিরুদ্ধে ভোট চুরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন তারেক রহমান।

মৌলভীবাজার বিএনপি আয়োজিত জনসভায় তিনি বলেন, “গত ১৫-১৬ বছর জনগণের ভোট ডাকাতি হয়েছে। এখন আবার একটি রাজনৈতিক দল একই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।”

হবিগঞ্জে দেওয়া বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের ষড়যন্ত্রে জড়িতদের কেউ দিল্লি, কেউ পিন্ডিতে পালিয়ে যায় কিন্তু বিএনপি দেশের মানুষের পাশেই আছে।

জামায়াতকে আক্রমণের পাশাপাশি সরকার গঠন করতে পারলে দেশের মানুষের জন্য কী কী করতে চান, সেইসব পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। 

জামায়াত ও এনসিপির পাল্টা আক্রমণ ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের বিরুদ্ধে ভোটারদের এনআইডি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। যদিও জামায়াত সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সতর্ক করে জানিয়েছে, ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এদিন সকালে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগ ও জনসভার মাধ্যমে প্রচার শুরু করেন। ওই জনসভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ জোটসঙ্গীরা বক্তব্য দেন।

জামায়াত আমির বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে বলেন, “২০০০ টাকা দিয়ে কোনো পরিবারের সমস্যার সমাধান হয় না। তার ওপর যদি চাঁদাবাজি হয়, তাহলে সেই সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, কার্ড দেওয়া হলে তা ঘুষ ছাড়া জনগণ পাবে কি না—সেটাই বড় প্রশ্ন।

অন্যান্য দলের প্রচার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরিশালে প্রচার শুরু করে। দলের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, মানুষ কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক রাষ্ট্র চায়।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি রংপুর-৩ আসনে লাঙ্গল প্রতীকে প্রার্থী।

বাম জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট শহীদ মিনার থেকে প্রচার শুরু করে। গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রচার শুরু করেন।

সংঘাত-সংঘর্ষ নিয়ে ইসির হুঁশিয়ারি প্রচারের প্রথম দিন কুমিল্লার হোমনায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। সিরাজগঞ্জে গণভোটের বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ঢাকার কেরাণীগঞ্জে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করা হয়েছে।

এদিকে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে ৬৭টি নির্বাচনি এলাকায় চার লাখ ৫৪ হাজার টাকার বেশি জরিমানা, ৫৯টি মামলা ও একাধিক নোটিস দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে প্রয়োজনে অভিযুক্ত প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।