প্রায় দেড় দশক ধরে সাভারের আশুলিয়ায় বসবাস করে পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন লিটন শেখ ও নাসিমা আক্তার দম্পতি। ভোট নিয়ে তাদের আগ্রহের কমতি নেই। নির্বাচন নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘‘ভোট দিতে ভালোই লাগে। গতবার তো ভোট দিতে পারি নাই। এবার ভোট দিতে চাই।’’
তাদের ঘরের মেঝেতে দেখা গেল দুইজন প্রার্থীর লিফলেট। বললেন, ‘‘প্রার্থীরা সরাসরি আসেননি, তাদের লোকজন এসে এই লিফলেট দিয়ে গেছে। এরমধ্যে স্মৃতিসৌধে মিছিল দেখে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুকে চিনেছেন। তারা বললেন, ‘‘চুরি, ছিনতাইমুক্ত নিরাপদ ও জলাবদ্ধতামুক্ত সাভার উপহার দেবে, এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।’’
শুধু লিটন-নাসিমা দম্পতিই নয়, সাভারের রেডিও কলোনি, ছায়াবীথি, হরিণ ধরা, আশুলিয়ার পলাশবাড়ী, নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়া নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন তারা। কেউ কেউ এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কাকে ভোট দেবেন। আবার কেউ কেউ দোদুল্যমান। বলছেন, শেষ সময় পর্যন্ত যাকে ভালো মনে হবে, যার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে, তাকেই ভোট দেবেন।
কী বলছেন পোশাক শ্রমিকরা পলাশবাড়ী এলাকায় পোশাক কারখানায় কর্মরত রুপা আক্তার বলেন, ‘‘আমরা চাই আমাদের চলাফেরায় কোনো সমস্যা হবে না। রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকবে না। কেউ কোনো সমস্যা করবে না। এসব যে করতে পারবে, তাকে ভোট দেব।’’
একই কথা বলেন শারমিন সুলতানা নামে স্থানীয় গৃহিণী। তিনি বলেন, ‘‘ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। তারা বাইরে গেলে চিন্তা হয়। রাস্তায় নিরাপত্তা নেই। আর সড়কে যানজট। এই অবস্থার নিরসন চাই।’’
বড় ফ্যাক্টর নারী ও পোশাক শ্রমিকরা শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত সাভার ও আশুলিয়ার বাসিন্দাদের বড় অংশ পোশাক ও বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকরা। বিগত নির্বাচনে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তারা। ভোটারদের বৃহৎ অংশের বসবাসও কারখানা সংশ্লিষ্ট এলাকায়।
আগামী নির্বাচনে পোশাক শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোটাররাই ভোটের ফলাফলের নির্ধারক হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আশুলিয়ার একটি বেসরকারি বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় বিপুল সংখ্যক পোশাক শ্রমিক বসবাস করে। তারা যেদিকে ভোট দেবে, তিনিই এগিয়ে থাকবেন। এজন্য প্রার্থীদের শ্রমিকদের সুবিধার কথা তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সম্প্রতি সাভার-আশুলিয়ার ৪৩টি শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন কমিটি’ সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা-১৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের কাছে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জনসংখ্যা অনুপাতে শ্রমিক কলোনি, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডে-কেয়ার সেন্টার, খেলার মাঠ ও আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ; জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা; শ্রমিকদের নিরাপদ চলাচলের জন্য সড়কে আলোকবাতি, সিসি ক্যামেরা ও যাত্রী ছাউনি স্থাপন; ঝুট ব্যবসা, মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা; রেশনিং ব্যবস্থা ও ফেয়ার প্রাইস শপ চালু, ফ্যামিলি কার্ড প্রবর্তন এবং বাড়িভাড়া আইন কার্যকর করা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আট প্রার্থী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৯ (সাভার, আশুলিয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন প্রার্থী। তারা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রার্থী দিলশানা পারুল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ফারুক খান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ইসরাফিল হোসেন সাভারী, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী শেখ শওকত হোসেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. বাহাদুর ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. কামরুল।
ভোটার সাড়ে ৭ লাখ সাতটি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও একটি সেনানিবাস এলাকা নিয়ে ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনে মোট ২৭৫টি ভোটকেন্দ্রের ১ হাজার ৫২৩টি ভোট কক্ষে ভোট দেবেন ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটার। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৭ জন ও নারী ভোটার ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৫০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন।
ঢাকা-১৯ সাভার আসনটি পূর্বে ছিল ঢাকা-১২ আসনের অন্তর্গত। এতে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান।
সীমানা পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৯ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ, এরপর ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এনামুর রহমান, সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আশুলিয়া থানা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম।