আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বা ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ জেলায় সংসদীয় আসন তিনটি। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থীরা প্রতিবারের নির্বাচনে এখান থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। আর অন্যদলের প্রার্থীরা জামানাত হারিয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় গোপালগঞ্জ-১ আসনে দীর্ঘদিনের ভোটের সমীকরণ বদলে গেছে। বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ত্রিমুখী লড়াইয়ে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এ আসনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম শিমুল এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়াকে কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের ভোট টানতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। ভোটারদের অভিমত, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যে প্রার্থী বিপদে আপদে পাশে থাকবেন, তাকেই নির্বাচিত করবেন।
চান্দারবিলবেষ্টিত মুকসুদপুর উপজেলা ও কাশিয়ানীর একাংশ নিয়ে গোপালগঞ্জ-১ আসন গঠিত। স্বাধীনতা পরবর্তী এ আসনের সবকয়টি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। এর মধ্যে ছয়বার নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) মো. ফারুক খান। তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরাজিত করেন।
তবে এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারায়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের ভোট বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের পক্ষে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ভোটের দিন যতই এগিয়ে আসছে, বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম, জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুল হামিদসহ দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি বা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোট চাইছেন।
তবে এ আসনে ফ্যাক্টর হতে পারে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। দলীয় প্রার্থী বাদে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়পত্র বৈধ হয়েছে। তাঁরা হলেন মুকসুদপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুকসুদপুর পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম শিমুল এবং আনিসুল ইসলাম। এর মধ্যে আশরাফুল আলম শিমুলকে ঢাকার রমনা এলাকায় একদল যুবক মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করলে পুলিশ তাকে জুলাই আন্দোলনে সহিংসতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থেকে ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়া। তার বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও উচ্চ আদালতে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পান তিনি। এতে তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ভোটার বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন ধরনের মামলা-হামলার ভয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে রয়েছে। সেইসঙ্গে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে না পারায় নির্বাচনি মাঠ একেবারে ফাঁকা। এই ফাঁকা মাঠে গোল দিতে মাঠে নেমে পড়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ফলে যে প্রার্থী এলাকার মানুষের কল্যাণে ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন, সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন, তাঁকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে চান তারা। দিন যত গড়াবে নির্বাচনি মাঠ ততই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।’’
বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এ আসন একটি বিশেষ দলের দখলে ছিল। এ এলাকার মানুষ কখনো স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি। ভোটারদের একটি বিশেষ দলের প্রতি দুর্বলতা আছে। এবারে তাঁরা নির্বাচনে নেই, আর নির্বাচনও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে। নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে। ভোটারেরা যদি সুষ্ঠুভাবে, ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দিতে পারে তাহলে আমি জয়ী হব। ধানের শীষ জয়লাভ করবে।’’
জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুল হামিদ বলেন, ‘‘গোপালগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান আছে। আমরা প্রায় দেড় বছর ধরে গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে-ময়দানে কাজ করছি। আমরা মনে করি, আওয়ামী লীগ যেহেতু মাঠে নেই। আমাদের দল স্বচ্ছ দল। আমাদের দলে দুর্নীতি নেই, চাঁদাবাজি নেই। এ কারণে শিক্ষিত যুবসমাজ আমাদের ভোট দেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমরা জয়ী হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা হবে।’’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘আমি নির্বাচিত হলে এলাকার নারীদের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে কুটির শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখব। তাঁর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখব।’’