বৈচিত্র্যের জন্য ভারতীয় সিনেমার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দেশটির প্রতিটি আঞ্চলিক চলচ্চিত্র শিল্পের নিজস্ব গল্প বলার ধরন ও দর্শকের পছন্দ রয়েছে। বলিউড, তামিল, তেলেগু থেকে শুরু করে ভারতীয় বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি ও ভোজপুরি সিনেমার মতো ক্রমবর্ধমান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলো ধীরে ধীরে প্যান-ইন্ডিয়া দর্শকের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। এখনকার দর্শকরা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে গল্পই উপভোগ করছেন!
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে রিমেক নতুন কোনো বিষয় নয়। বহু আগে থেকেই সফল সিনেমাগুলো নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় নতুন করে বানানো হয়েছে। একটি সিনেমা যখন ব্যাপক হিট হয়, তখন এর গল্প অন্যান্য আঞ্চলিক দর্শকদের জন্য উপযুক্ত করে তোলা হয়। আবেগ, সহজ প্রেমের গল্প ও ভালো সংগীত—সাধারণত এই উপাদানগুলো কোনো সিনেমাকে রিমেকের জন্য আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। ভারতীয় একটি সিনেমা সবচেয়ে বেশি ভাষায় রিমেক হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশেও এই সিনেমার রিমেক হয়েছে, এতে অভিনয় করেছেন প্রাক্তন তারকা দম্পতি শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস। রেকর্ড গড়া ভারতীয় সিনেমাটি নিয়েই এই প্রতিবেদন—
লাইভ মিন্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তেলুগু ভাষার একটি সিনেমা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভাষায় রিমেক হওয়ার রেকর্ড গড়েছে। মোট ৯টি ভাষায় রিমেক হয়েছে সিনেমাটি। সর্বোচ্চ রিমেকের রেকর্ড এখনো ধরে রেখেছে এটি। ভারতীয় এই সিনেমার নাম—‘নুভোস্ট্যানেন্টি নেনোদদানতানা’। তেলেগু ভাষার এই সিনেমা ২০০৫ সালে মুক্তি পায়। সিনেমাটির প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেন সিদ্ধার্থ ও তৃষা কৃষ্ণান। এটি নির্মাণ করেন প্রভু দেবা। চলুন দেখে নিই, কোন ভাষায় কী নামে সিনেমাটির রিমেক হয়েছে— ১. উনাকুম এনাকুম (তামিল, ২০০৬) ২. নীনেলো নানাল্লে (কন্নড়, ২০০৬) ৩. আই লাভ ইউ (ভারতীয় বাংলা, ২০০৭) ৪. নিনগোল থাজবা (মণিপুরী, ২০০৭) ৫. সোনা চাঁদি মো রূপা চাঁদি (ওড়িশা, ২০০৯) ৬. তেরা মেরা কি রিশতা (পাঞ্জাবি, ২০০৯) ৭. নিঃশ্বাস আমার তুমি (বাংলা, বাংলাদেশ, ২০১০) ৮. দ্য ফ্ল্যাশ ব্যাক: ফরকেরা হেরদা (নেপালি, ২০১০) ৯. রামাইয়া ভাস্তাভাইয়া (হিন্দি, ২০১৩)
‘নুভোস্ট্যানেন্টি নেনোদদানতানা’ সিনেমার গল্প ও বক্স অফিস ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের একটি গ্রামে বেড়ে উঠে সিরি নামে একটি মেয়ে। তার বড় ভাই শিবরামকৃষ্ণা তাকে মানুষ করেন। ২০ বছর আগে তাদের ধনাঢ্য বাবা অন্য এক নারীকে বিয়ে করে। এরপর সিরি, শিবরামকৃষ্ণা ও তাদের মাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কিছুদিন পরই তাদের মা মারা যায়। ফলে মাত্র ১৩ বছর বয়সি শিবরামকৃষ্ণা বোন সিরির দায়িত্ব নেয়।
উত্তরাধিকারসূত্রে দুই ভাই-বোন সামান্য কৃষিজমি পায়। এ জমির এক কোণে তাদের মায়ের কবর দেয়। কিন্তু জমিদার মুদ্দু কৃষ্ণাইয়া দাবি করেন—ওই জমি তার। কারণ তাদের মা তার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেনি। মুদ্দু কৃষ্ণাইয়া কবরটি সরিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু শিবরামকৃষ্ণা তার মায়ের কবর না সরানোর অনুরোধ করে এবং ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ চায়।
শিবরামকৃষ্ণা প্রতিশ্রুতি দেয়, দিন-রাত পরিশ্রম করে ঋণ পরিশোধ করবেন। তাতে সম্মত হয় না মুদ্দু। পরে স্থানীয় স্টেশন মাস্টার শিবরামকৃষ্ণার দায়িত্ব নিলে মুদ্দু কৃষ্ণাইয়া রাজি হয়। অক্লান্ত পরিশ্রম করে শিবরামকৃষ্ণা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে দেয়। পাশাপাশি বোন সিরিকে মানুষ করে। শিবরামকৃষ্ণাও একজন সফল কৃষক হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে, সিরি পড়াশোনা চালিয়ে যায়। কেবল তাই নয় কাছের একটি শহর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করে। এমন গল্প নিয়ে এগিয়েছে ‘নুভোস্ট্যানেন্টি নেনোদদানতানা’ সিনেমার কাহিনি।
তেলেগু ভাষার ‘নুভোস্ট্যানেন্টি নেনোদদানতানা’ সিনেমায় সিরি চরিত্রে অভিনয় করেন তৃষা কৃষ্ণান। তার ভাই শিবরামকৃষ্ণা চরিত্রে অভিনয় করেন শ্রীহরি। সিনেমাটিতে তৃষার বিপরীতে অভিনয় করেন সিদ্ধার্থ। ২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শক-সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়ায়। কোনো কোনো সমালোচক সিনেমার চিত্রনাট্যকে ‘অত্যন্ত টানটান’ বলে মন্তব্য করেন। ১০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করে ১৮ কোটি রুপির বেশি। ২০০৫ সালে বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়কারী তেলুগু সিনেমায় পরিণত হয়। কেবল তাই নয়, নয়টি বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও জিতে নেয় সিনেমাটি।
*লাইভ মিন্ট, সিয়াসাত অবলম্বনে