ক্যাম্পাস

ক্যানসার জয় করে ৫ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় নূহা

ক্যান্সারকে হার মানিয়ে অদম্য মেধা ও সাহসের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে পঞ্চগড়ের মোছাঃ নুসরাত জাহান নূহা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও পড়ালেখা চালিয়ে গিয়ে এবারের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে নূহা।

নূহার বাড়ি পঞ্চগড় শহরের মিঠাপুকুর এলাকায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। তার বাবার নাম আরমান আলী খাঁন।

জানা যায়, ২০২০ সালের মার্চ মাসে হাঁটুর ব্যথা থেকে নূহার ক্যান্সার শনাক্ত হয়। সে সময় করোনা মহামারির কারণে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রমসহ সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। তখন নূহা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

ক্যান্সারের কারণে নূহার ডান পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে ফেলতে হয়। বর্তমানে সেখানে একটি কৃত্রিম প্রস্থেটিক ডিভাইস সংযুক্ত রয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিক চলাফেরা তার জন্য কষ্টসাধ্য।

তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা নূহার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ২০২৩ সালে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দু’বারই জিপিএ-৫ অর্জন করে সে। শুধু তাই নয়, এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুর বোর্ডে ১৭তম স্থান অর্জন করে নূহা। এসএসসির পর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেখানে পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে নিজ এলাকাতেই মানবিক বিভাগে ভর্তি হয় সে। এইচএসসির পর ঢাকায় গিয়ে ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলেও সরাসরি ক্লাস করতে না পেরে অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।

সব বাধা পেরিয়ে নূহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে। তার স্বপ্ন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা করে বিচারক হওয়া।

নূহা বলেন, “ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। শারীরিক কষ্ট থাকলেও পড়ালেখা ছাড়িনি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েও শারীরিক সমস্যার কারণে সেখানে পড়তে পারিনি। একইভাবে ভর্তি কোচিং সেন্টারেও অনলাইনে ক্লাস করতে হয়েছে। আল্লাহর রহমতে আজ এই সাফল্য। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ে বিচারক হয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। আমার সবকিছুতে পাশে ছিলেন আমার বড় বোন আফরোজা বেগম মনি।”

নূহার বড় ভাই খালিদ, যিনি একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সম্প্রতি তার ফেসবুক পেজে এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে পরিবারের ক্যান্সারের দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন।

তিনি লেখেন, নূহার চিকিৎসার সময় তাদের পরিবারকে একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। একই সময়ে পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এসব কষ্টের মধ্যেও তার বাবা-মা মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সামলে সন্তানদের পাশে থেকেছেন।

খালিদ আরো লেখেন, চিকিৎসকেরা একপর্যায়ে নূহার পা কেটে ফেলার কথা বললেও পরে ডান পায়ের টিবিয়া হাড় কেটে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্থেটিক ডিভাইস বসানো হয়। বর্তমানে নূহার শরীরে আর কোনো ক্যান্সার সেল নেই বলে জানান তিনি।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নূহার বাবা আরমান আলী খাঁন বলেন, “নূহা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য বোনাস। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সে বিশেষ উপহার। আমি সন্তানদের এমনভাবে বড় করেছি যে জিপিএ-৫ না পাওয়া অসম্ভব। নূহাকে চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলাম, সেটা হয়নি। এখন চাই আইনে পড়ুক, পড়ালেখা শেষ করে একজন সফল মানুষ হোক।”