সাক্ষাৎকার

‘সবগুলো অপশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বইমেলার সময় নির্ধারণ করেছি’

নানাবিধ কারণে অমর একুশে বইমেলা নিয়ে প্রকাশক, লেখক, পাঠকদের প্রশ্ন আছে, চিন্তা আছে; দুশ্চিন্তাও আছে। এ বছর বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। সময় নির্ধারণ হওয়ার পরেও প্রকাশকদের অনেকে বলছেন—মেলা ঈদের পরে করার। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম জানালেন মেলার সময়সূচিতে কেন এই পরিবর্তন, আর কেনই-বা ঈদের পরে মেলার আয়োজন সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বরলিপি। 

রাইজিংবিডি: আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরু হতে যাচ্ছে। যেহেতু রোজার মধ্যে বইমেলা—বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারের মেলায় আমরা কী পরিবর্তন দেখতে পাবো?

মোহাম্মদ আজম: বইমেলা শুরু হবে ২টায়, শেষ হবে রাত ৯টায়। মেলা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই জন্য যে, যেহেতু রোজার সময় দুপুরে অনেক লোক ফ্রি থাকে, এবং কেউ কেউ সন্ধ্যার পরে হয়তো মেলায় থাকবে না; তাদের সুবিধার জন্য মেলার সময় এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেলায় তারাবির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইফতার করার সুযোগ থাকবে। যারা আগ্রহী তারা ইফতার বা তারাবির পরেও মেলায় থাকতে পারবেন। 

রাইজিংবিডি: নানাবিধ কারণে চলতি বছর মেলা শুরুর সময় পিছিয়েছে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী বলে মনে করছেন অনেক প্রকাশক। তারা স্টল ভাড়ার বিষয়ে সরকারের ভর্তুকি আশা করছেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মোহাম্মদ আজম: ইতোমধ্যে আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় স্টল ভাড়া থেকে শতকরা পঁচিশভাগ ভর্তুকি দিয়েছে। যদিও প্রকাশকদের আরও বেশি দাবি ছিল কিন্তু সরকার যদি পরবর্তীকালে আবার বিবেচনা করে, সেটা দেখা যাবে। কিন্তু আপাতত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে এটা বিবেচিত হয়েছে এবং ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। 

রাইজিংবিডি: অনেক প্রকাশক চাচ্ছেন ঈদের পরে মেলা হোক। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আপনার কী বলবার আছে?

মোহাম্মদ আজম: আমাদের দেশের হিসেবে ১৫মার্চ পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা কম। কিন্তু কোনো কোনো প্রকাশক যারা এপ্রিলে মেলা করতে চান, সেটা তো আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণেই প্রায় অসম্ভব। কারণ বৈশাখী যে ঘূর্ণিঝড়, রোদ এবং ধুলা ইত্যাদি—সব কিছু বিবেচনা করলে মেলা করার জন্য এপ্রিল হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ সময়। কিন্তু এখন যে টাইমটাতে মেলা হচ্ছে, এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে কম। সেদিক থেকে বিবেচনা করে আমরা এই সময় নির্ধারণ করেছি। প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাইজিংবিডি: প্রকাশকদের মধ্যে কারা আলাপে অংশ নিয়েছিলেন?

মোহাম্মদ আজম: প্রকাশনার যে কেন্দ্রীয় সংগঠন ‘বাপুস’ প্রধানত তাদের সঙ্গেই কথা বলেছি। এবং এর বাইরেও আমাদের কমিটিতে আরও পাঁচ-ছয়জন প্রকাশক আছেন, উনাদের মতামতের ভিত্তিতে মেলার দিন ও সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। 

রাইজিংবিডি: এখানে লেখকদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন কিনা?

মোহাম্মদ আজম: লেখকদের মতামত অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। আমাদের মেলা কমিটিতে লেখক আছেন। তারা মতামত দিয়েছেন, সেটাকে আমরা ‘প্রতিনিধিত্ব’ বলতে পারি। কিন্তু এমনিতে আলাদা করে লেখকদের মতমত নেওয়ার তো কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা নাই, আসলে। লেখকদের মতামত যদি নিতে হয়, তাহলে কোন কোন লেখকের মতামত নেবো আমরা—তখন কিন্তু এই প্রশ্ন এসে যায়। মেলা কমিটির লেখকেরা মত দিয়েছেন, আমরা সেটা গ্রহণ করেছি।

রাইজিংবিডি: চলতি বছর বইমেলার আয়োজন করতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন?

মোহাম্মদ আজম: চ্যালেঞ্জ তো এই  মেলায় অবশ্যই আছে। যেহেতু ইলেকশন এবং বিশ তারিখ থেকে মেলা শুরু হচ্ছে। সেটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমাদের পক্ষে এর বাইরে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। আমরা তো ২০ ডিসেম্বর থেকে মেলার একটা ডেট দিয়েছিলাম কিন্তু সরকারের অনিচ্ছার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। যেহেতু ইলেকশন, সেজন্য সরকার বইমেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারবেন না বলে আমাদের তখন জানিয়েছেন। ফলে আমাদের ডিসেম্বরে মেলা করা সম্ভব হয়নি। প্রকাশকদের একটা অংশ তখন বুঝে বা না-বুঝে ভিন্ন ধরনের প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে। কিন্তু আমরা প্রধানত সরকারি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ওই তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছি। আমাদের হাতে আর কোনো অপশন ছিল না। আমরা সবগুলো অপশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বইমেলার জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি সময়টাকেই কিছু সমস্যা সত্তেও শ্রেষ্ঠ বিকল্প হিসেবে নির্ধারণ করেছি।

রাইজিংবিডি: বাংলা একাডেমি এখন পর্যন্ত অনেক সাহিত্যিকের নামে পুরস্কার প্রবর্তন করেছে। নতুন আর কোনো পুরস্কার প্রবর্তনের কথা আপনারা ভাবছেন কিনা?

মোহাম্মদ আজম: সেটার জন্য আমাদের কিছু আবেদন আছে। সেটা আমাদের নির্বাহী পরিষদ হয়তো কোনো কোনোটা অনুমোদন করবে।

রাইজিংবিডি: আপনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ নিয়ে দুটি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর আমরা দেখেছি মেলার ‘ডাস্টবিন’ কাণ্ড নিয়ে খুবই সমালোচনা হলো। 

মোহাম্মদ আজম: দেখেন, বইমেলাটা একটা বিরাট পাবলিক ফাংশন। এটার অনেক কিছু বাংলা একাডেমি কিংবা মেলা পরিচালনা কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এটার অনেকগুলো জিনিসই জাতীয় রাজনীতি, জাতীয় অবস্থা, সংস্কৃতি এগুলোর সাথে যুক্ত। এই ফাংশনের অকেটাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যুক্ত। ফলে যে ব্যাপারগুলো আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত সেই ব্যাপারগুলো (নিশ্চয় আমরা যুক্ত) পুরোপুরি দেখার কোনো কাঠামোগত সুযোগ আমাদের নাই। আমাদের তো নিজেদের পুলিশ নাই, সুতরাং বুঝতে হবে যে কতকগুলো ব্যাপারে আমরা আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের ওপর নির্ভরশীল।