দীর্ঘ ১৯ বছর পর নির্বাচনি জনসভার মধ্য দিয়ে বগুড়ার মাটিতে পা রেখেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সফর জেলায় নির্বাচনি উত্তাপ ছড়িয়েছে। তারেক রহমানের ‘আমি তো আপনাদেরই সন্তান’ বক্তব্য বগুড়াবাসীর হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এই বক্তব্য ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
বগুড়ার জনসভায় তারেক রহমান তার ভাষণে ‘আমি তো আপনাদেরই সন্তান’ উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্য বগুড়ার মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটেছে। দীর্ঘদিন পর দলের প্রধান নেতার পৈতৃক জেলায় সফর ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলবে।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বগুড়ায় আসেন তারেক রহমান। সন্ধ্যায় তিনি শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।
লন্ডনে প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার পর এটাই নিজ নির্বাচনি এলাকায় তার প্রথম সফর। ২০০৬ সালে সর্বশেষ বগুড়ায় এসেছিলেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) এবং ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
বগুড়ার গাবতলীতে তারেক রহমানের বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক বাড়ি। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-৭ আসনে (গাবতলী উপজেলা ও শাজাহানপুর উপজেলা) বিএনপির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিটি নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
তারেক রহমানের বগুড়া সফর জেলার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বগুড়া শহরের রিকশাচালক শাজাহান আলী বলেন, ‘‘আমাদের ছোল (সন্তান), বগুড়ার ছোল আসিছে। কালকে আসছিল দেখছি, আজকে চলে গেল। ভালো লাগলো। আমাদের সুন্দরভাবে যেন দিন প্রহর চলে। আমরা তো বগুড়ার মানুষ। তারেক আমাগের কাছের মানুষ।’’
বগুড়া শহরের বাসিন্দা দীপালি (৪৫) বলেন, ‘‘তারেক রহমান বলেছেন, তিনি বগুড়ারই সন্তান। এরপর ভোট কাকে দেবো মন ঠিক করছি। আমি ধানের শীষে ভোট দেব।’’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ আছে। এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ভোটার উপস্থিতি ছিল কম।
ইউনুস আলী নামে এক ভ্রাম্যমান পিঠা বিক্রেতা বলেন, ‘‘১৭-১৮ বছর পর সরকারি নির্বাচন হবে। মানুষ শান্তিতে ভোট দিবে। সাংবাদিক ভাইয়েরা থাকবে, পুলিশ ভাইয়েরা থাকবে, নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে। নিরিবিলিভাবে মানুষ যাবে, ভোট দেবে, এই আমাদের প্রার্থনা।’’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। তবে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটিএন নিউজের বগুড়া ব্যুরো প্রধান চপল সাহা তারেক রহমানের বগুড়া সফর ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবে। তিনি বলেন, বগুড়া আগে থেকে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও কয়েকটি আসনে দলটির অবস্থান কিছুটা দুর্বল মনে হচ্ছিল। তবে তারেক রহমানের আগমনে সেই চিত্র বদলে গেছে। তার নওগাঁ থেকে বগুড়ায় আসার পথে মানুষের ঢল এরই প্রমাণ।
তিনি বলেন, ‘‘তারেক রহমানের ‘আমি তো আপনাদেরই সন্তান’ বক্তব্য মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এছাড়া তিনি শুধু বগুড়ার নয়, সারা দেশের উন্নয়নের কথা বলেছেন, যা মানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। এর ফলে বগুড়ায় বিএনপির অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে।’’
তিনি ধারণা করছেন, ‘‘বগুড়ার সাতটি আসনই বিএনপির দখলে যাবে। বিশেষ করে সদর আসনে বিপুল ভোটে জয় আসবে।’’
সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সাঈদ বলেন, ‘‘বগুড়া জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের এলাকা। দীর্ঘ ১৯ বছর পর তারেক রহমান বগুড়ায় আসায় মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘তাঁর হাত নেড়ে অভিবাদন, মানুষের সঙ্গে করমর্দন এবং বক্তৃতায় বলা, ‘আমি তো আপনাদেরই সন্তান’, এ কথা মানুষের মন গলিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব ভোটের রাজনীতিতে স্পষ্টভাবেই পড়বে।’’
বগুড়ায় তারেক রহমানের জনসভায় ব্যাপক জনসমাগনে তারেক রহমান এবং বিএনপির প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখছেন বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনি মাঠে এত বড় জনসভা বগুড়ার মানুষ আগে কখনো দেখেনি। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ঢল এবং ভালোবাসা দিয়ে প্রিয় নেতা, বগুড়ার সন্তান তারেক রহমানকে বরণ করে নেওয়া সত্যিই কল্পনাতীত।’’
এই সাংবাদিক নেতা বলেন, ‘‘এর মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হয়েছে, বগুড়া বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। এই জনসভা আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে।’’
জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘‘১৯ বছর পর নিজের এলাকায় এসে আবেগে তারেক রহমান বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার থেমে গেছেন, যা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।’’