নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় বাঙালিদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিহারীর বসবাস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে আলোচনায় উর্দু ভাষাভাষী বিহারি ভোটাররা। সৈয়দপুর শহরের একাধিক ওয়ার্ডে তাদের ভোটের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। সেই কারণে প্রচারের মাঠে বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দুতেও মাইকিং, বিলবোর্ড, ফেস্টুন দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
সৈয়দপুরে বিহারি জনগোষ্ঠীর বসবাস কয়েক দশকের পুরনো হলেও ভোটার তালিকা তাদের নাম উঠেছে বেশি দিন নয়। এখন বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ভোটার। তবে উর্দুভাষী অবাঙালি এবং মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য বাংলাদেশে তাদের আলোতে আসার সুযোগ হয়নি বললেই চলে। পল্লিভিত্তিক ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগের অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাদকপ্রবণতায় ঝুঁকে পড়ার ভয়াবহতার মধ্যে বসবাস করতে করতে তাদের জীবনে বঞ্চনার জ্বালা তৈরি করেছে।
বিহারিদের সঙ্গে কথা হলে তাদের জবানে উঠে আসে বঞ্চনার কথা, হাড়হাড্ডি পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার গল্প। প্রতিবার নির্বাচন এলে তাদের কদর বেশ বেড়ে যায়। তবে এবার তারা বলছেন ভিন্ন কথা। বঞ্চনার জ্বালা মেটাতে যিনি এগিয়ে আসবেন, তাকেই তারা ভোট দেবেন। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, তাদের জীবনের জ্বালা কখনো নিভবে না।
বিহারির মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও তাদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার সব চেষ্টাই করছেন প্রার্থীরা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু এলাকায় বিহারি ভোটাররা জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন; যার প্রভাব নীলফামারী-৪ আসনটির ফলাফল বদলে দিতে পারে।
নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সৈসদপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে নীলফামারী-৪ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪৯ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৪২৭ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ২১৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন। এই আসনে আগের নির্বাচনের তুলনায় ভোটার বেড়েছে ২২ হাজার ৫৬২ জন।
সৈয়দপুর উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৪ জন। এর মধ্যে অবাঙালি বা বিহারি ভোটার ৭৮ হাজার ৬৭ জন, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৮৪৬ জন বেশি। ফলে নির্বাচনি সমীকরণে এই ভোটারদের বড় নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করে একসময় ভারতের বিহার অঞ্চল থেকে আগত শ্রমিকরা সৈয়দপুরে বসবাস শুরু করেন। দেশভাগ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরও বিভিন্ন সময় অবাঙালিদের বসতি বাড়তে থাকে। এর ফলে সৈয়দপুর ধীরে ধীরে বাঙালি-বিহারীর মিশ্র শহর হিসেবে পরিচিতি পায়।
এই আসনে এবার মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৈয়দপুরকেন্দ্রিক অবাঙালি ভোটারদের সমর্থনই এবার বিজয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এর মধ্যে জাতীয় পার্টির মো. সিদ্দিকুল আলম (লাঙ্গল), জামায়াতের আব্দুল মুনতাকিম (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির মো. আব্দুল গফুর সরকার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শহিদুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মির্জা মো. শওকত আকবর রওশন (কাঠাল), বাসদ মার্কসবাদীর মাইদুল ইসলাম (কাচি), স্বতন্ত্র তিন প্রার্থীদের মধ্যে রিয়াদ আরফান সরকার (ফুটবল), এস এম মামুনুর রশিদ (মোটরসাইকেল) ও জোয়াদুর রহমান হীরা (ঘোড়া)।
উর্দুভাষি অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিহারি ভোটারদের চাওয়া খুব আলাদা কিছু নয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান আর নাগরিক সুবিধা তাদের মূল দাবি। শহরের কাঁচা বসতিগুলোতে এখনো সঠিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। বর্ষা এলে জলাবদ্ধতা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
আব্দুল ওয়াহাব নামে একহন বিহারি ভোটার বলেন, “ভোট চাইতে সবাই আসে। কিন্তু ভোটের পরে আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমাদের বাচ্চাদের স্কুল, চিকিৎসার ব্যবস্থা আর কাজের সুযোগ চাই।”
সৈয়দপুরের বিহারি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে কাজে জড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সরকারি হাসপাতাল থাকলেও দূরত্ব, জনবল সংকট আর সচেতনতার অভাবে অনেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা গ্রহণও তাদের সাধ্যে কুলায় না।
করিম উদ্দিন বলেন, ‘‘আমাদের বাচ্চাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য সেরকম কোনো সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় না। তাই আমাদের সন্তানরা অল্প বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লেগে যায়। এ জন্য কম বয়সেই তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।’’
উর্দুভাষী নেতা আব্দুল মজিদ বলেন, ‘‘সৈয়দপুরে প্রায় ৭০ হাজার উর্দুভাষী ভোটার রয়েছে। সবাই নিজের পছন্দমতো ভোট দেয়। তারপরও তাদের ভোটে প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয় অনেক সময়। প্রার্থীরা নির্বাচন এলে আমাদের কাছে ধর্না দেন। ভোট নিয়ে আর খোঁজ রাখেন না। আমরা বেশ কিছুদিন থেকে ৭ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। এবার সংসদ নির্বাচনে যিনি নির্বাচিত হবেন; তিনি হয়তো আমাদের দাবিগুলো মেনে নিবেন।’’
বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার বলেন, ‘‘উর্দুভাষী মানুষেরা সবসময় বিএনপির সঙ্গে থাকে। আর বিএনপি দীর্ঘসময় ফ্যাসিস্টের হাতে নির্যাতিত এবং ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের উন্নয়ন হয়নি। আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাদের সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’’
স্থানীয় রাজনীতিকরা স্বীকার করছেন, সৈয়দপুরে বিহারি ভোট উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পৌর ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে এই ভোটই ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
একজন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এখন আর বিহারিরা আলাদা করে ভোট দেয় না, এমন ধারণা ঠিক নয়। তারা হিসাব করে ভোট দেয়। কে বাস্তবে কাজ করবে, সেটাই তাদের কাছে মুখ্য।”
এবারের নির্বাচনি প্রচারে উর্দু ভাষায় মাইকিং, লিফলেট আর সরাসরি উঠান বৈঠক চোখে পড়ছে। কিছু প্রার্থী উর্দু ভাষাভাষী কর্মীদের দিয়ে ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে বিহারি ভোটারদের অভিযোগ, অনেক সময় এই গুরুত্ব কেবল নির্বাচনের আগ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে।
সৈয়দপুরে বিহারি ভোটারদের ভূমিকা তাই শুধু সংখ্যার নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তারও। নির্বাচনের ফল যাই হোক, এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় বিষয়।
জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম বলেন, ‘‘আমরা সবসময় তাদের পাশে ছিলাম। আমাদের নেতাকর্মীরা বিহারি মানুষদের বিপদে-আপদে সবসময় ছিল। তারা আমাদের কাছে কিছু দাবি দিয়েছে, যা তাদের যৌক্তিক দাবি। আমরা তাদের দাবির সঙ্গেই আছি।’’
উর্দুভাষী বিহারিরা এবার আর আশ্বাস চান না। তাদের বিপদে-আপদে যাকে পাশে পাবেন, তাকেই তারা ভোট দেবেন।
জাতীয় পার্টির মো. সিদ্দিকুল আলম বলেন, ‘‘‘আমাকে মূলত উর্দুভাষী মানুষগুলোই নির্বাচনে প্রার্থী হতে বারবার তাগাদা দিয়েছে। আমি তাদের উন্নয়নের জন্য নির্বাচিত হয়ে কাজ করতে চাই।’’