সারা বাংলা

বগুড়ায় ভোটের উত্তাপ, ইস্যুতে নজর ভোটারদের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিনদিন বাকি। বগুড়ার সাত আসনে শুধু দল বা প্রতীক নয়- উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবারের ভোটের ফল নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এসব ইস্যু বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দুর্বলতা তুলে ধরছেন তারা। 

বগুড়া জেলায় ৯ রাজনৈতিক দলের ৩৪ জন প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে থাকলেও মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ- এই দুটি বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে। ইতোমধ্যে দল দুটি জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বগুড়ার ৭টি আসনই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে চায় দলটির নেতাকর্মীরা। জামায়াত বলছে, তারা সবগুলো আসনেই ভালো করবে। তবে ৭টির মধ্যে অন্তত ৩টি আসন জামায়াতের দখলে যেতে পারে বলে ভোটাররা ধারণা করছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বগুড়াকে ‘বিএনপির দুর্গ’ বলা হলেও শুধু তারেক রহমানের আসন ছাড়া অন্যান্য আসনে জয় পেতে বিএনপিকে ঘাম ঝরাতে হবে।  

এদিকে, ভোটারদের মন জয় করে ভোটের পাল্লা ভারী করার চেষ্টার পাশাপাশি বগুড়ার দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয় এমন কৌশল অবলম্বনের প্রবণতাও দেখা গেছে দল দুটির মাঝে। এর মধ্যে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ এনে প্রার্থিতা বাতিলের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাল্টাপাল্টি আবেদনের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনেও বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধের ঋণের তথ্য হলফনামায় গোপনের তথ্য প্রকাশ করে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়েছে। ওই প্রার্থী এটিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ষড়যন্ত্রমূলক অপকৌশল হিসেবে দেখছেন।

এ দিকে, কম কর্মী-সমর্থক নিয়েও ভোটের মাঠে আলোচনায় এসেছেন বগুড়ার একমাত্র নারী প্রার্থী দিলরুবা নূরী। তিনি বাসদ মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী। তার মূল শ্লোগান, ‘কোটিপতি, দুর্বৃত্ত আর সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব নয়, সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান’।

অন্যদিকে, শেষ সময়ে এসে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বগুড়া-২ আসনের জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ। তিনি আসনটিতে টানা তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার দাবি, তার নির্বাচনি এলাকায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। তার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা রয়েছে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তারা সবাই ঘরছাড়া। তার লোকজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে- এমন অভিযোগ এনে একটি খোলা চিঠি লিখে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। যদিও নির্বাচনের শেষ সময়ে তার এমন পদক্ষেপকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে বগুড়ার ৭টি আসনেই এখন নির্বাচনি প্রচারণা চরমে। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওবার্তায় প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে মূল ইস্যু নদীভাঙন ও কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য। বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের ভোটাররা উন্নয়নের কাজের হিসাব চাইছেন, তরুণরা দাবি করছেন কর্মসংস্থান। বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) আসনে রেল যোগাযোগ, স্বাস্থ্যখাত এবং ক্রীড়া খাতে উন্নয়নসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিও দাবি রয়েছে ভোটারদের। বগুড়া- ৪, ৫ ও ৭ (শেরপুর-ধুনট-গাবতলী) আসনে কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন, শিল্পপার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন গুরুত্ব পাচ্ছে। বগুড়া-৬ (সদর) আসনটি নির্বাচন করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রার্থীরা এখানে যানজট ও ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের টোপ দিচ্ছেন ভোটারদের।

বগুড়ার ভোটারদের মধ্যে এবার কেবল ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতা নেই। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছ রাজনীতি প্রত্যাশা করছেন। বগুড়া-৬ আসনের ভোটার ইউনুস শেখ রোহান বলেন, ‘‘আমরা সরকারের কাছে দেশের ও জনগণের কল্যাণ প্রত্যাশা করি। সরকার ও জনগণ একসাথে দায়িত্বশীল হলে ভালো কিছু সম্ভব।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘শুধু উন্নয়ন নয়, এর সাথে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থানও দরকার মানুষদের। কারণ আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা কিন্তু অনেক। আমি মোটা দাগে যেটা বলতে চাই সেটা হলো, দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। ঘরে ঘরে শিক্ষা পৌঁছাতে পারলে এবং শিক্ষিত মানুষকে কর্মঠ করে তুলতে পারলে দেশের উন্নয়ন আপনাতেই আসবে।’’

বগুড়া-২ আসনের তরুণ ভোটার তানভীর হোসেন বলেন, ‘‘আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি শুধু রাজনীতি করবেন না, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।’’

‘‘নির্বাচন-পরবর্তী গুম-খুন বন্ধ হওয়া, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, অর্থ পাচার রোধ ও চাকরিতে অনিয়ম বন্ধ হবে নতুন সরকার এলে,’’ বলেন বগুড়া-১ আসনের তরুণ ভোটার নজরুল ইসলাম। একইসঙ্গে তিনি চান, যে সরকারই আসুক নতুন ফ্যাসিবাদ যেন না গড়ে ওঠে। এলাকার জনপ্রতিনিধি যেন মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখেন, প্রকৃত উন্নয়ন করেন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়েন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘‘এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি হবে। বিএনপি একটি বা দুটি আসন হারিয়েও ফেলতে পারে। কারণ, আগে বিএনপি ও জামায়াত একত্রে থাকায় তাদের ভোটের ব্যবধান অনেক বেশি থাকতো। বর্তমানে জামায়াত ও বিএনপি আলাদা হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।’’

বগুড়া-৭ আসনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আসনটি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার। এই আসনে তিনিই নির্বাচন করতেন।  খালেদা জিয়া জাতীয় পর্যায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব। তার পরিবর্তে বর্তমানে যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তিনি সেই ওজনের প্রার্থী নন। এর ফলে জামায়াতের দিকে কিছু ভোট চলে যেতে পারে।’’ 

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘‘গত ১৬ বছরে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক কারণে বগুড়াকে বঞ্চিত করেছে। জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে এখানে উন্নয়ন হয়নি। বগুড়ায় যত উন্নয়ন হয়েছে, তা বিএনপির আমলেই হয়েছে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারও উন্নয়ন হবে।’’

সরকারি সুবিধা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করা হবে, যা রেশন কার্ডের মতো সবাই পাবে, এতে দলীয়করণের সুযোগ থাকবে না।’’

ভোটের পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো থাকলেও কিছু জায়গায় আইডি কার্ডের ছবি তোলা ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে, যা ভোট কেনাবেচার সন্দেহ তৈরি করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।’’

মাঠে একটা কথা খুব জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে, বিএনপি এবার দুই থেকে তিনটি আসন হারাবে। এ প্রসঙ্গে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘‘এগুলো হচ্ছে বট বাহিনীর অপপ্রচার। ইনশাআল্লাহ বগুড়ার জনগণ তাদের প্রিয় সন্তান তারেক রহমানকে ৭টি আসনই উপহার দেবে।’’

বগুড়া শহর জামায়াতের সেক্রেটারি আ স ম আব্দুল মালেক জানান, তারা এবার নির্বাচনে আশাবাদী এবং নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছে। ভোটাররাও উৎসাহিত বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় বিভাগ বাস্তবায়ন, প্রথম শ্রেণির সিটি কর্পোরেশন গঠন, যানজট নিরসন, পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সাতমাথায় ওভারব্রিজ এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ জামায়াতের প্রধান পরিকল্পনা।

ভোটের পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘদিন মানুষ ভোট দিতে না পারায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও এবার ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিএনপির আইডি কার্ড বা মোবাইল নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এসব প্রতিপক্ষের অভিযোগ মাত্র, বগুড়ায় এমন কোনো ঘটনার অস্তিত্ব নেই। জামায়াত জনগণের শক্তিতেই বিশ্বাস করে।’’

সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সভাপতি গণেশ দাশ মনে করেন, বগুড়া বিএনপির দুর্গ ছিল থাকবে। সেক্ষেত্রে সবগুলোতে বিএনপি জয়ী হবে। তবে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তারা রুট লেভেলে চলে গেছে। জামায়াতের মহিলা ভোটার অনেক বাড়ছে। সেক্ষেত্রে জামায়াতের ভোট বাড়বে।

সাংবাদিক এই নেতা বগুড়া-২ আসনে জাপার প্রার্থী শরীফুল ইসলাম জিন্নাহর ভোটবর্জনকে কৌশল হিসেবে দেখছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘তার ভোট বর্জন করারই কথা ছিল। তার নামে একাধিক মামলা আছে। সে আওয়ামী দোসর, দীর্ঘদিন টানা এমপি ছিল। নির্বাচনের মাঠে গেলে মব সৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণে সে মূলত নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভোট বর্জন করে একটা খোঁচা দিয়েছে।’’

১২ উপজেলা ও ১১ পৌরসভা নিয়ে গঠিত বগুড়া জেলায় জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ৭। জেলায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৮০ হাজার ৮৭১ জন, নারী ভোটার ১৫ লাখ ১ হাজার ২৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪২ জন।