নির্বাচনি প্রচারের শেষে সময়ে এসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সামাজিক বৈষম্য মুক্ত ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা থেকে রাজনৈতিক দল এনসিপির প্রধানের দায়িত্ব নেওয়া নাহিদ।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কখনো আফগানিস্তান হবে না। এটা বাংলাদেশই থাকবে। অনুকরণীয় হতে পারে মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ।”
“ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক চর্চার জায়গায়। আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় বিভাজনের কারণ না হয়ে এর ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থান,” যোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তিনি বলেন, “দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৮ বছর বয়সি সব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা হবে। একইসঙ্গে সশস্ত্র ব্যবস্থাকে আধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে।”
“আমরা কারো সঙ্গে শত্রুতা চাই না। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কারো পুতুল রাষ্ট্র হতেও রাজি নই,” যোগ করেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে। ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য মেনে নেওয়া হবে না।”
ভারতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ভারতে যেখানে মুসলিমরা প্রায় নির্যাতনের শিকার হন, সেখানে বাংলাদেশে উসকানিমূলক পরিস্থিতিতেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় রক্ষায় এগিয়ে যায় মুসলমানরা।”
“দেশবাসী ভুলে যায়নি– ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন চালু ছিল। ক্ষমতা হারানো কায়েমি স্বার্থবাদী মহল অচল কথাগুলো নতুন মোড়কে উপস্থাপন করছে। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ জীবনধারা বা পোশাকরীতি নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেবে না। হিজাব বা বোরকা পরা যেমন একজন নারীর অধিকার, তেমনি আধুনিক পোশাক পরিধানের পূর্ণ স্বাধীনতাও অন্যদের থাকবে,” যোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে নাহিদ বলেন, “সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের মাধ্যমে বৈকালিক সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করে শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।”
ভাষণে বিগত শাসনামলে পাচার হওয়া প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “লুণ্ঠনকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা একটি পাবলিক ট্রাস্টের অধীনে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এ ছাড়া ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে হওয়া বিগত দিনের লুটপাটের বিচার করা হবে।”
পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব রেখে তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ রাখা হবে। কেন্দ্রীয় দলীয়করণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই বাহিনীর নিয়োগ ও পদায়ন সম্পূর্ণ উপজেলাভিত্তিক করা হবে।”
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ এবং প্রবাসীদের অভিবাসন খরচ কমানোর বিষয়ে এনসিপির ইশতেহারে থাকা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের পথরেখা তুলে ধরেন তিনি।
ভোটারদের প্রতি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে চাঁদাবাজি ও ভারতীয় আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম।