সারা বাংলা

সিলেটের পাঁচ আসনে জটিল হয়ে উঠেছে বিএনপির জয়ের সমীকরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে অন্তত পাঁচটি আসনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলা স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে একদিকে বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বদলে যাচ্ছে জয়ের সমীকরণ।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় বিএনপির একটি অংশের ক্ষোভের আগুনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন দলীয় প্রার্থীরাই। পরিস্থিতি যে অনুকূলে নয়, তা দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও অনুধাবন করছে। এ কারণে বিদ্রোহী ও শরিক দলের প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যে ৩০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

তবে এই বহিষ্কার সিদ্ধান্ত উল্টো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। একসময় যারা গোপনে কাজ করতেন, সেই নেতারা এখন প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। ফলে সিলেট-৫, সুনামগঞ্জ-৩, সুনামগঞ্জ-৪, মৌলভীবাজার-৪ ও হবিগঞ্জ-১- এই পাঁচটি আসনে বিএনপি ও শরিক দল জমিয়তের প্রার্থীরা পড়েছেন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।

সুনামগঞ্জ-৩: বিদ্রোহী ব্যারিস্টারের দাপট

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূল লড়াই বিএনপির দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেনের মধ্যে। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আঞ্চলিকতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও দলীয় কোন্দলের কারণে ব্যারিস্টার আনোয়ার তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার ভোট, আওয়ামী লীগের একটি বড় ভোটব্যাংক এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের ভোটও বিদ্রোহী প্রার্থীর দিকে যেতে পারে- এমন ধারণা ভোটারদের। জগন্নাথপুর উপজেলায় বিএনপির একটি বড় অংশ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে না থাকায় কয়ছর আহমদের অবস্থান ঝুঁকিতে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ-৪: দলীয় প্রার্থীর চেয়ে শক্ত বিদ্রোহী

সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ–৪ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলেরই সাবেক নেতা দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। চারবার উপজেলা চেয়ারম্যান ও একবার পৌর চেয়ারম্যান থাকা জাকেরীনের রয়েছে শক্ত নিজস্ব ভোটব্যাংক।

বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে জেলা বিএনপির একটি বড় অংশ মাঠে কাজ করছে- এ অভিযোগে ১৪ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। ফলে এই আসনেও বিএনপির ভেতরের বিভাজন নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সিলেট-৫: বহিষ্কারেও থামেনি বিদ্রোহ

জকিগঞ্জ–কানাইঘাট নিয়ে গঠিত সিলেট–৫ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ। বহিষ্কার হলেও বিএনপির বড় একটি অংশ এখনও মামুনুর রশিদের পক্ষে কাজ করছে।

এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসানও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ও আওয়ামী লীগের ভোট বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

মৌলভীবাজার-৪: জোটের জটিলতায় অনিশ্চয়তা

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার–৪ আসনে জোট রাজনীতির জটিলতায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে। বিএনপির দলীয় প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলেরই নেতা মো. মহসিন মিয়া মধু। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীর অবস্থান শক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জ-১: বহিষ্কৃত নেতার শক্ত অবস্থান

নবীগঞ্জ-বাহুবল নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া। জামায়াত প্রার্থী সরে যাওয়ার পর জামায়াতের ভোটের বড় অংশ সুজাত মিয়ার দিকে যেতে পারে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এতে করে এই আসনেও বিএনপির ভেতরের বিদ্রোহ নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।