রাইজিংবিডি স্পেশাল

তাদের কাছে ভোটের অর্থ কী

গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোট। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে জনগণ সরকার পরিচালনায় যুক্ত হয়। তারা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করেন।

নির্ধারিত সময়ের পর সংসদীয় আসনে জনপ্রতিনিধি বাছাই করার জন্য ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনেও জনগণকে ভোট দিতে হয়।এজন্য জনগণকে মাঝে-মধ্যে ভোটের মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানাতে হয়। 

এসব নির্বাচনে দেশের ১৮ বছর ঊর্ধ্বের বয়সের সব নাগরিকের ভোটের মান একই। অর্থাৎ একজন নাগরিক, তিনি যে শ্রেণি-পেশার-বয়সের-শিক্ষার হন না কেন একটি ভোট দিতে পারেন। তার সেই ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। এই জনপ্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করেন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। আবার তাদের ভুলে জনগণের ভাগ্যে দুর্দশা নেমে আসতে পারে। 

কিন্তু রাষ্ট্রের সব ভোটার কী ভোটের এই তত্ত্ব বা গুরুত্ব জানেন বা বোঝেন? নিশ্চিতভাবে বলা যায়, স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত ভোটারদের বড় অংশ সেটা বোঝেন না। তারপরও তারা ভোট দিতে যান। সরকার পরিচালনায় অংশ নেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা ভোট দেবেন। তারা কেন ভোট দেন, তাদের কাছে ভোটের অর্থ কী, তাদের সঙ্গে কথা বলে সেটা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

ভোলার লালমোহন উপজেলায় বাড়ি কামালের। বয়স পঞ্চশোর্ধ্ব। তিনি ঢাকায় থেকে একটি অফিসে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। তিনি জানান, তিনি ঢাকার ভোটার। এবার পরিবেশ ভালো থাকায় ভোট দিতে যাবেন। 

তিনি বলেন,“ভোট রাষ্ট্রের সম্পদ। ভোট দিলে দেশের, মানুষের ভালো হয়। তাই অবশ্যই ভোট দিতে যাব।”

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠার বিষয়ে তিনি বলেন, “সবাই খারাপ না, দু-একজন খারাপ আছে, তাদের জন্য সবার দুর্নাম হয়।”

ঢাকার খিলগাঁওয়ে একটি বহুতল ভবনে নিরাপত্তকর্মী হিসেবে চাকরি করেন ইনায়েত আলী। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি গ্রামের বাড়ির ভোটার। এজন্য ভোট দিতে তার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে আছে। 

তিনি বলেন, “আমার বাড়ির সবাই ভোট দিতে যায়, আমিও যাব।” তাকে ভোট দিয়ে লাভ কী-পাল্টা প্রশ্ন করা হলে তিনি একই উত্তর দেন, “সবাই যায়, আমিও যাব।” 

তবে ভোট দিলে দেশের উন্নয়ন হবে বলে মনে করেন ঢাকার রিকশাচালক রমিজ উদ্দীন। তার পরিবার থাকে গাইবান্ধায়, গ্রামের বাড়িতে। তিনি গ্রামের ভোটার। তিনি বলেন, “এলাকার উন্নয়নের জন্য ভোট দেই।” 

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগানে শ্রমিক আমোদ মাল। তিনি চা শ্রমিকদের স্বল্প বেতন, কষ্টের জীবন, সন্তানদের ভালো চাকরি না পাওয়ার কথা বলেন। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে এসব সমস্যার সমাধান চান এবং এজন্য ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করেন। 

তিনি বলেন, “নির্বাচনে আসলে প্রার্থীরা আসে। দেয় নানা প্রতিশ্রুতি। পড়ে আর তাদের দেখা পাওয়া যায় না। বাস্তবায়ন হয় না তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি। আমাদের ভোটে নির্বাচিতদের ভাগ্যে পরিবর্তন আসে। তাদের ভোট দিয়েও আমাদের শিকলবন্দি জীবনের পরিবর্তন নেই।” 

আমোদ মালের মতো চা বাগানের শ্রমিক পঞ্চায়েত নেতা কার্তিক বাকতি, শ্রমিক কনিকা রায়, কুমিলা বাড়াইক, মনীন্দ্র মাল, অজিদ সাঁওতাল, সজল চৌহান, অমৃত তাঁতী একই কথা বলেন।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কৃষক জালাল উদ্দিন ৫৫ বছরের জীবনে বহুবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু যে অভিপ্রায় নিয়ে তিনি ভোট দিয়েছেন, তা পূরণ হয়নি। ভোট দিলে তার এলাকার রাস্তা, সেতু, স্কুল, চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন হবে বলে মনে করেছিলেন তিনি, তা হয়নি।

একই উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের বাসিন্দা ম‍ৃত রসমত আলীর ছেলে মোহাম্মদ কুদ্দুস মিয়া ভোট দেন, যাতে তিনি শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। তিনি ভোট দিয়ে যে সরকার বানান, সেই সরকারের কাছে তিনি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।

মোহাম্মদ কুদ্দুস মিয়া বলেন, “আমি ভোট দেই যাতে দেশে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারি। আমাদের জান ও মাল সরকার হেফাজত করবে এবং আমাদের সুখে-দুখে সাথে থাকবে, এজন্য নির্বাচনে ভোট দেই। সরকার বানাই শুধুমাত্র এই আশায়, তাদের কাছে এটাই চাওয়া।” 

জনপ্রতিনিধিদের কাছে নিরাপত্তা চান বরগুনা খুচরা মাছ বাজারে মাছ বিক্রেতা রাফিন (৩৫)। তিনি ভোট দিয়ে যে সরকার বানাবেন, সেই সরকারের প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা চান। 

রাফিন বলেন, “গত মাসে দিনভর মাছ বিক্রি করে রাতে বাড়ি ফেরার সময় খেজুরতলা এলাকায় আমার সাইকেল থামিয়ে সারা দিনের রোজগার করা টাকা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। থানায় গেলাম, কত নেতাদের কাছে বিচার নিয়ে গেলাম, কেউ কিছুই করল না।” 

এই হতাশায় এবার ভোট দিতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তার।

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভোট দেন টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ রইশ মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ ফরিদ মিয়া ( ৩৮)। তিনি বলেন, “ভোট দেই কেবল দেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। আমরা শান্তিতে সুন্দর একটা পরিবেশে যাতে একটু বাঁচতে পারি, এর জন্য ভোট দেই।”

তবে গণতন্ত্র বা কেন ভোট দেন তা বোঝেন না কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার প্রত্যন্ত ঝুনকার চরের বাসিন্দা মইনুদ্দিন। তিনি বলেন, “আমরা চরাঞ্চলের মানুষ, ভোট বুঝি কিন্তু গণতন্ত্র সেভাবে বুঝি না। আমরা জানি, ভোট আসলে ভোট দিতে হয়; তাই ভোট দেই।”

রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের কালিরপাঠ এলাকার দিনমজুর আশরাফ আলীর কাছে দেশ, গণতন্ত্র ও ভোটের মানে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওসব আমাদের বুঝে লাভ নেই। তাই ওসব বিষয় নিয়ে চিন্তাও করি না। সারা দিন কাজ করার পর বাজারে গেলে চায়ের দোকানে টিভিতে সিনেমা দেখি। মাঝে-মধ্যে খবরও দেখা হয়। ভোট আসলে যাকে ভালো মনে হয়, তাকে ভোট দেই।”

চিলমারী উপজেলার রমনা চিলমারী এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল নৌকাঘাটে শ্রমিকের কাজ করেন। রাজনীতি বোঝেন না, বোঝার চেষ্টাও করেন না। কেন তিনি ভোট দেন-প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “যারা ভোটে দাঁড়ায়, তারা আমাদের কাছে ভোট চায়। কেউ চা খাওয়ায়। সবাই ভোট দিতে যায়, আমিও যাই।”

একই এলাকার ষাটোর্ধ্ব নারী নুরী বেগম বলেন, “আমরা মহিলা মানুষ, ভোট নিয়ে ওত কিছু বুঝি না। ভোট আসলে সবাই ভোট দিতে যায়, আমিও যাই। সবাই যাকে বলে তাকে ভোট দেই।” 

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সুনামগঞ্জের প্রতিনিধি মনোয়ার চৌধুরী, কুড়িগ্রামের প্রতিনিধি বাদশা সৈকত, হবিগঞ্জের প্রতিনিধি মো. মামুন চৌধুরী এবং বরগুনার প্রতিনিধি ইমরান টিটু।)