সিলেট থেকে যে নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছিলেন, টানা ১৮ দিন সারা দেশ ঘুরে ধানের শীষের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোট চাওয়ার সেই সফর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শেষ করলেন ঢাকায়। আর প্রচারের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করে নির্বাচনে বিএনপির জয়ের আশা নিয়ে ফিরলেন ঘরে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার পর্ব শেষ হচ্ছে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায়। সেই অনুযায়ী, সব দলই নির্বাচনি জনসভার ইতি টেনেছে সোমবার রাতেই। তারেক রহমানও তার নির্বাচনি প্রচারের নির্ধারিত সূচি শেষ করেছেন।
তারেক রহমান ভোটের মাঠে ধানের শীষের প্রচারে দেশবাসীর দোয়া-সমর্থন আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, দিয়েছেন দিন বদলের প্রতিশ্রুতি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বৈষম্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওয়াদা করে ভোট চেয়েছেন তিনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী-প্রতিপক্ষের সমালোচনার চেয়ে তারেক রহমানের নির্বাচনি জনসভায় গুরুত্ব পেয়েছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পরিকল্পনা, যা বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ‘দ্য প্লান’-এ সবিস্তারে হাজির করা হয়েছে। এই প্ল্যান নিয়ে ২২ জানুয়ারি থেকে ১৮ দিন দেশের নগর-মহানগর-শহরে ছুটে গেছেন, যা তিনি শেষ করেছেন সোমবার ঢাকায় ৮টি জনসভার মাধ্যমে।
নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিনটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সূচি ছিল তারেক রহমানের। এদিন ঢাকা-১৭ দিয়ে শুরু করে আটটি জনসভায় বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের বার্তা দিয়ে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত, খালেদা জিয়ার আপোসহীন রাজনৈতিক দর্শন এবং দেশ পরিচালনায় বিএনপির অভিজ্ঞতার আলোকে মুক্তচিন্তার অগ্রসর বাংলাদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য বাসযোগ্য উন্নত এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন তারেক রহমান।
এবারের সংসদ নির্বাচনে ‘ভাইরাল আসন’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা মতিঝিল, পল্টন ও রমনা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের জন্য ভোট চেয়েছেন তারেক রহমান। তবে ভোট কারচুপি প্রতিরোধে আব্বাসকে সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকায় নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসনের কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে বিএনপির জনসভায় তারেক রহমান গুপ্ত ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন। সেখানে তিনি ব্যালটের নকল সিল তৈরির কিছু ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
ঢাকা-৯ আসনে দেশের পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ভোটারদের রায় দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান।
ঢাকা-৬ আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী করতে পুরান ঢাকার মানুষের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি। সেখানে তিনি পুরান ঢাকার অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবি তারেক রহমানের কাছে তার নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের পক্ষে স্থানীয় অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও পানি-নিষ্কাশনের সমস্যা সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরলে তিনি তা পূরণের আশ্বাস দেন।
ঢাকা-৫ আসনে তারেক রহমান ঘোষণা করেন, একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। নারীদের স্বাবলম্বী করা, কৃষি ও শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং বিদেশগামী কর্মীদের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
রাজধানীর লালবাগ বালুর মাঠে ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় দলীয় প্রার্থী হামিদুর রহমান হামিদের পক্ষে ভোট চান তারেক রহমান। স্থানীয় সমস্যার সমাধানে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।
লন্ডনে থাকা অবস্থায় বিএনপির রাজনীতির নীতিনির্ধারক হয়ে উঠেলেও চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। আপোসহীন দেশনেত্রীর মৃত্যুতে নির্বাচনমুখী দলের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয় তারেক রহমানকে। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবার সিলেট থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও ঢাকায় দেশ গড়ার পরিকল্পনা প্রচার করে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে ভোট চেয়েছেন তিনি।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে থাকা সমমনা ১২ দলের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ভোটের প্রচারে তারেক রহমানকে যেমন রাজনৈতিক আক্রমণ করতে হয়েছে, তেমনি পাল্টা আক্রমণের তীরও মোকাবিলা করতে হয়েছে; যা তাকে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে।
তারেক রহমানের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতাসহ খুন-ধর্ষণের ঘটনা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি ফ্যাসিবাদের অবসানে ‘জুলাই স্পিরিট’ ধারণ করে জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। জামায়াত পাল্টা আক্রমণে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ’ দল হিসেবে তুলে ধরে সৎ মানুষ ও ইনফাসের পক্ষে ভোট চেয়েছে।
জামায়াতের প্রচারে ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য তারেক রহমানের জনসভাকেও প্রভাবিত করেছে। তারেক রহমানকে ‘মুনাফিক, শিরিককারী’ হিসেবে জামায়াতকে সমালোচনা করে বক্তব্য দিতে শোনা গেছে। সেই সঙ্গে হিন্দু ভোটারসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুও বারবার তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
‘যা বলার ছিল, তা বলা হয়েছে’- একথা আপাতত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য তারেক রহমানসহ সবার জন্যই প্রযোজ্য। এবার বলা কথার মূল্য দেশের ভোটাররা কতটা দিয়েছে, সেটি দেখার পালা। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলে সেই প্রতিফলন দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ, তাতে চোখ রয়েছে গোটা বিশ্বেরও।