বর্তমান ডিজিটাল জীবনে দিনের বড় অংশই কাটে মোবাইল বা ল্যাপটপের সামনে। কিন্তু স্ক্রিনের উচ্চতা সঠিক না হলে তা ধীরে ধীরে ঘাড়, কাঁধ এবং ওপরের পিঠে নানা ধরনের ব্যথার কারণ হতে পারে—এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ডাবল বোর্ড-সার্টিফায়েড অ্যানেস্থেসিওলজি ও ইন্টারভেনশনাল পেইন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কুনাল সুদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের মাথার ওজন সাধারণত ১০ থেকে ১২ পাউন্ড। কিন্তু মোবাইল বা ল্যাপটপ দেখার সময় ঘাড় যখন সামনে ঝুঁকে যায়, তখন সার্ভাইক্যাল স্পাইনের ওপর চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। প্রায় ৪৫-৬০ ডিগ্রি কোণে মাথা ঝুঁকলে ঘাড়ের ওপর কার্যত ৪০-৬০ পাউন্ড সমপরিমাণ চাপ পড়তে পারে, যা স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
দীর্ঘমেয়াদে কী সমস্যা হয় দীর্ঘ সময় ধরে সামনে ঝুঁকে বসে কাজ করলে ঘাড়ের পেশি, জয়েন্ট এবং আশপাশের টিস্যুর কার্যকারিতায় পরিবর্তন আসে। এতে সার্ভাইক্যাল এক্সটেনসর মাংসপেশি, আপার ট্রাপিজিয়াস এবং লেভেটর স্ক্যাপুলা পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলস্বরূপ দেখা দিতে পারে পেশির ক্লান্তি, ট্রিগার পয়েন্ট, জয়েন্টের মেকানিক্সের পরিবর্তন এবং টেনশন-টাইপ বা সার্ভিকোজেনিক মাথাব্যথা—যে ব্যথা ঘাড় থেকে শুরু হয়ে মাথায় অনুভূত হয়।
এছাড়া দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে থাকলে উপরের পিঠে টান, কাঁধে অস্বস্তি এবং ঘাড়ের নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রিন ব্যবহার না করলেও পেশিতে অতিরিক্ত টান থেকে যায়, যা দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকদের মতে, মানসিক চাপ পেশির টান বাড়াতে পারে, তবে অনেক সময় সমস্যার মূল কারণ থাকে স্ক্রিনের ভুল উচ্চতা ও খারাপ বসার ভঙ্গি। তাই সঠিক ভঙ্গি ঠিক করা গেলে ব্যথার চক্র অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কেন কারও মাথাব্যথা, কারও ঘাড়ব্যথা? অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. রঘু নাগারাজ জানান, স্ক্রিন খুব নিচে বা খুব ওপরে থাকলে মাথা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সামনে সরে আসে, যাকে বলা হয় ফরোয়ার্ড হেড পোস্টার। এতে ঘাড়ের পেশি ও জয়েন্টের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেশিতে টান, জয়েন্টে চাপ এবং রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়ার কারণে কারও মাথাব্যথা, আবার কারও ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা দেখা দেয়। কোন পেশি বেশি চাপের মধ্যে পড়ছে এবং ব্যক্তিভেদে ব্যথা অনুভবের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে উপসর্গের ধরন ভিন্ন হতে পারে। যে লক্ষণগুলো সতর্কবার্তা: পোস্টারজনিত সমস্যার কিছু সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ হলো—
• সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ঘাড় শক্ত লাগা • দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় বা মাথায় মৃদু ব্যথা বাড়া • দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর ব্যথা বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্রাম বা নড়াচড়ায় কমে আসা • মাথার পেছনের অংশে চাপ বা ভারী লাগা • ঘাড় ও কাঁধে নিয়মিত টান অনুভব করা
সমস্যা কমাতে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন, বসে কাজ করার সময় কান যেন কাঁধের সরল রেখায় থাকে এবং দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে না বসে প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পরপর উঠে দাঁড়ানো, হাঁটা বা স্ট্রেচিং করা উচিত। ঘাড় পেছনে নেওয়ার ব্যায়াম করা উচিত।
উল্লেখ্য, সঠিক স্ক্রিন উচ্চতা, সচেতন বসার ভঙ্গি এবং নিয়মিত ছোট বিরতি—এই তিনটি অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে ঘাড় ও মাথাব্যথা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস