‘‘আমাদের শিক্ষার দরকার আছে, চিকিৎসার দরকার আছে, বস্ত্রের দরকার আছে, খাদ্যের প্রয়োজন আছে। কোনো প্রার্থী কি পারবে, এই প্রয়োজন মেটাতে? যারা এই প্রয়োজন মেটাতে পারবে, আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব।’’
কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ষাটোর্ধ ছালেহা খাতুন।
ছালেহা খাতুনের মতো আরেক নারী সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের গোবিন্দি গ্রামের সন্ধানী রাণী। তার ভাষ্য, ‘‘আমাদের কর্ম প্রয়োজন। যারা ভোটে জিতবে, তারা যেন আমাদের কর্মের ব্যবস্থা করে দেয়। আমরা নিজেদের কর্ম নিজেরাই করব। কর্ম করে সন্তান মানুষ করব। কর্ম থাকলে আর অন্যের উপর নির্ভর করতে হবে না।’’
দেশের নদীভাঙন ও মঙ্গা পীড়িত জেলাগুলোর মধ্যে গাইবান্ধা অন্যতম। নদ- নদীবেষ্টিত জেলার চার উপজেলায় ১৮৫টি চর ও দ্বীপ চর রয়েছে। এ সব চরাঞ্চলে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ বসবাস করে। যাদের অধিকাংশেরই পেশা কৃষি। শ্রমজীবী সহজ-সরল এ সকল মানুষ এবার ভোট দেওয়ার ব্যাপারে বেশ সচেতন।
আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হবে। এ দিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
বিগত বছরের নির্বাচনে নদীভাঙন রোধে টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেখেনি চরের নারী ভোটাররা। তারা বলছেন, এবার যিনি বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তাকেই ভোট দেবেন তারা।
সরেজমিনে চরাঞ্চলের নারী ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদ-নদীবেষ্টিত গাইবান্ধার সাধারণ মানুষের কাছে এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যু নদীভাঙন রোধ ও চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের নানামুখী সমস্যার সমাধান। প্রতি বছর নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে হাজারো মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। ফলে এবার ভোটাররা এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান, যিনি এসব সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দিতে পারবেন।
চরের বড় একটি অংশ নিয়ে গাইবান্ধা-৫ আসন (সাঘাটা ও ফুলছড়ি) গঠিত। এই আসনে ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৭ ও নারী ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
পুরুষ এবং নারী ভোটার প্রায় সমান হলেও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখছেন ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর ঘাটের লাকি বেগম। তিনি বলেন, ‘‘পুরুষের মজুরি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর আমরা যারা বাড়িতে থাকি, প্রয়োজন হলে কামলা খাটি, আমাদের ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দেয়। যারা নারী-পুরুষ সমান অধিকার দিতে পারবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।’’
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর ঘাটের আরেক নারী মর্জিনা বেগম। অনেকটা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘‘যামরা ভোটত দাঁড়ায়, তামরা আসিয়্যে মাও, খালা, চাচি, বুবু কত কি কয়া ভোট নিয়ে যায়। ভোট হলে আর খোঁজ থাকে না।’’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘‘বন্যার পানি আলে (এলে) ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়্যা যায়। স্কুল, হাটবাজার যাওয়া আসার জন্যে কোনো রাস্তাঘাট নাই। যামরা এই রাস্তাঘাট করি দিবে, হামরা তামাকেই ভোটটা দেম।’’
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর দুই পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভাঙা-গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। সামর্থ্যবানরা বসতভিটা সরিয়ে নিতে পারলেও অসচ্ছলরা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গাইবান্ধা-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার চরের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, ‘‘নদীর তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে মানুষের অভিশাপ নয়, আশীর্বাদে পরিণত করা হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি উৎপাদন বাড়ান, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।’’
ব্রহ্মপুত্রের অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় দুই লাখ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলে নেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, হাসপাতাল কিংবা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক; অধিকাংশ চরে নেই পুলিশ ফাঁড়ি। নদীর কিছু কিছু স্থানে বাঁধের প্রতিরক্ষা কাজ শুরু হলেও বাকি অংশে প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। টেকসই বাঁধ ও নদী শাসন পরিকল্পনার অভাবে এ দুর্ভোগ বছরের পর বছর চলছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে এ আসনে নির্বাচন করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়ারেছ আলী। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ এবং বস্ত্র শিল্প নির্মাণ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন নাহিদুজ্জামান নিশাদ। নদীভাঙনকে সাঘাটা-ফুলছড়ি এলাকার অস্তিত্বের সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘এটি আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, বরং বাঁচা মরার প্রশ্ন। আমি নির্বাচিত হলে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনকবলিত পরিবারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেব।’’