সাতসতেরো

নারীর ভোটাধিকার আন্দোলন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বাস্তবতা

মাওবাদী আন্দোলনের নেত্রী ও তাত্ত্বিক অনুরাধা গান্ধির ডায়েরি থেকে সংকলিত বই ‘Philosophical Trends in the Feminist Movement’ সাম্প্রতিক সময়ে পড়ার সুযোগ হয়। বইটিতে নারীবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষত প্রতিটি ধারার দার্শনিক অবস্থান ও এর সীমাবদ্ধতাকে তিনি তুলে এনেছেন।

বইটা পড়তে গিয়ে ভাবছিলাম, যে ভোটাধিকারকে এখন একেবারে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার—অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় নিয়মেই যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিক পেয়ে থাকে — বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেটাও আপনাআপনি নাজেল হয়নি। ভোটাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, নারীর ভোটাধিকার কোনো স্বাভাবিক বা স্বতঃসিদ্ধ অধিকার নয়, এটি বহু লড়াই ও সংগ্রামের ফল। এই উপলব্ধিই অনুরাধা গান্ধির বইটি সবচেয়ে শক্তভাবে সামনে নিয়ে আসে।

ভোটাধিকার আন্দোলনের সূচনা ইউরোপে এবং এর গোড়ায় ছিল শ্রেণিভিত্তিক প্রশ্ন। আঠার ও উনিশ শতকে ভোট দেওয়ার অধিকার সীমাবদ্ধ ছিল জমির মালিক, করদাতা কিংবা অভিজাত পুরুষদের মধ্যে। শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমজীবী পুরুষেরা ভোটাধিকারের দাবি তুললে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের এই প্রসারমান পর্যায়েও নারীরা রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক হিসেবে গুরুত্ব পায়নি।

এই বাস্তবতা থেকেই নারীরা উপলব্ধি করেন—রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হলে রাজনৈতিক স্বীকৃতি অর্জন জরুরি। আর সেই স্বীকৃতির প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে ভোটাধিকার। ফলে ভোটাধিকার নারীদের কাছে কেবল একটি অধিকার নয়, বরং রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার এক প্রাণান্তক দাবি হয়ে ওঠে। এই সংগ্রাম থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসখ্যাত ‘Womens Suffrage Movement।’

নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের গোড়ায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রথম সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে ওঠে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নারীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

উনিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনে কিছু শিক্ষিত নারী সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সে সময় নারীরা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ভূমিকা পালন করতেন। সমাজের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তারা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের মুক্তির আন্দোলনে অংশ নেন। লুক্রেশিয়া মট, এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন, সুসান অ্যান্থনি এবং অ্যাঞ্জেলিন গ্রিমকে—এরা সবাই ছিলেন দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নারী কর্মী।

এই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে নারীরা প্রথমবার প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিসরে সংগঠিতভাবে কথা বলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কিন্তু এই আন্দোলনের ভেতরেই তারা এক ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হন। দাসপ্রথা-বিরোধী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরে নারীদের প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়। এই অভিজ্ঞতা নারীদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এরাই পরবর্তীতে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের নারীরা একত্র হতে শুরু করেন এবং শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, বিবাহ ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সংগঠিতভাবে কথা বলতে থাকেন। এর মধ্যেই রাজনৈতিক অধিকারের দাবি আরো জোরালো হয়ে ওঠে।

১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Seneca Falls Convention-এ প্রথমবারের মতো নারীর ভোটাধিকারের দাবি রাজনৈতিক ঘোষণার রূপ পায়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়—রাষ্ট্র যদি নারীর সম্মতি ছাড়া আইন প্রণয়ন করে, তবে সেই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না। যুক্তরাজ্যে এই আন্দোলন আরো সংঘাতপূর্ণ রূপ ধারণ করে। Suffragette আন্দোলনের কর্মীরা শান্তিপূর্ণ প্রচারের পাশাপাশি নাগরিক অবাধ্যতা, অনশন ও কারাবরণে অংশ নেন। এর ফলস্বরূপ ১৯১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেনে প্রথমবারের মতো ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে পুরুষ ও নারীর ভোটাধিকারে পূর্ণ সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—নারীরা ভোটাধিকারকে কেবল একটি অধিকার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে নিজেদের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। পরবর্তীতে পশ্চিমা দেশগুলোর এই অভিজ্ঞতা দ্রুতই অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নিউজিল্যান্ড ১৮৯৩ সালে প্রথম দেশ হিসেবে নারীদের পূর্ণ ভোটাধিকার প্রদান করে। ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো ১৯০০–এর দশকের শুরুতেই নারীর ভোটাধিকার স্বীকার করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে নারীর ভোটাধিকার সংবিধানিক স্বীকৃতি পায়।

এক পর্যায়ে ভোটাধিকার আন্দোলন আর কেবল লিঙ্গভিত্তিক দাবি ছিল না; এটি যুক্ত হয়ে যায় জাতীয় মুক্তি, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে সার্বজনীন ভোটাধিকার গ্রহণ করে, যেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য রাখা হয়নি। এর আগে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে সীমিত আকারে নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়।

বর্তমানে আমরা বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আছি। নির্বাচনি আসন সংখ্যা ৩০০, যার মধ্যে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০টি। নারী ভোটার মোট জনগণের প্রায় অর্ধেক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৭৮ জন। তবে কিছু রাজনৈতিক দল থেকে কোনো নারী প্রার্থী নেই এবং যেসব দলে নারী প্রার্থী রয়েছে, সেখানেও অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নারীদের জীবনমান, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে প্রশ্ন উঠে আসে, যে ভোটাধিকার একদিন শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফল ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই আবার নতুন ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে। ভোটাধিকার থাকলেও যদি নারীরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারেন, তবে সেই অধিকার বাস্তবে কতটা কার্যকর থাকে—এই প্রশ্নটি আজ নতুন করে সামনে আসে। নারীরা যদি একদিন ভোটাধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনে না নামতেন, তবে আজ রাষ্ট্র নারীদের নিয়ে এত দায়িত্বশীল প্রতিশ্রুতির প্রয়োজনই বোধ করত না। কিন্তু সেই রাজনীতিতে যদি নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনুপস্থিত থাকে, তবে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো শেষ পর্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারবে না।

লেখক: প্রকাশক