বিনোদন

মিমিকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার: নুসরাত জাহান

ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও তৃণমূলের প্রাক্তন সংসদ সদস্য মিমি চক্রবর্তী ও নুসরাত জাহান। পেশাগত সম্পর্কের প্রাচীর পেরিয়ে, ব্যক্তিগত জীবনেও তারা খুবই ভালো বন্ধু। টলিউডে তাদের ‘বোনুয়া’ বলেই ডাকে। মাঝে এ সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে বিষয়টি নিয়ে চর্চা কম হয়নি। 

বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মিমি চক্রবর্তীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে মিমিকে নিয়ে মন খুলে কথা বলেছেন নুসরাত জাহান। মিমির সঙ্গে নানা স্মৃতি, ঝগড়া ও দূরত্ব নিয়ে অকপট এই অভিনেত্রী। 

কথার শুরুতে নুসরাত জাহান বলেন, “বিশ্বাস করুন, আমাদের বন্ধুত্ব এতটাও ‘শীতল’ নয়। হ্যাঁ, মাথাগরম হলে মিমি মুখের উপরে হয়তো বলবে, নুসরাতকে নিয়ে কিচ্ছু বলব না। ওর সঙ্গে আমার ঝগড়া। তারপরেও দিনের শেষে দেখা হলে হাসি চাপতে চাপতে জড়িয়ে ধরবে। এই ভাব এই আড়ি! এই যেমন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির বাড়িতে ঘটল। পদ্মশ্রী পাওয়ার আনন্দে বুম্বাদার বাড়িতে আমরা সবাই। মিমি এসেই আমায় দেখে এগিয়ে এল। উপস্থিত ছবিশিকারিরা কিন্তু আমাদের আলিঙ্গনে উষ্ণতা খুঁজে পেয়েছেন।” 

মিমি চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে নুসরাত জাহান বলেন, “পুরুষেরা কতই না প্রেমপত্র লেখেন। বন্ধুর জন্মদিনে আমি না হয় বন্ধুত্বের খোলা চিঠি লিখলাম। আমাদের কত স্মৃতি। বন্ধুত্বের গোড়ার কথা আবছা। সম্ভবত ‘যোদ্ধা’ সিনেমার শুটিং। আমরা তখন এসভিএফ প্রযোজনা সংস্থায় কাজ করি। সিনেমাটিতে আমার একটি ‘আইটেম’ নাচ ছিল। প্রথম দেখা প্রযোজনা সংস্থার অফিসে। সিনেমায় আমরা বন্ধু। আমরা একসঙ্গে নাচের মহড়া দিতাম। মহড়ার পর আমি মিমির ঘরে, নয়তো মিমি আমার। বন্ধুত্বের সেই শুরু। তখন আমাদের কম করে দিন পনেরোর আউটডোর শুটিং থাকত। ওই ১৫ দিন আমরা পরস্পরের ছায়া। ওই সময় থেকে বন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছোল যে, পরস্পরের গোপনকথা, গোপনব্যথাও আর অজানা রইল না!”

মিমি-নুসরাতের বন্ধুত্ব ফুলের পাপড়ি মতো ফুটেছে। সেই গল্প জানিয়ে নুসরাত জাহান বলেন, “শুধু আড্ডা? খাওয়াদাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, কেনাকাটা—সবকিছুতেই আমরা দু’জন। ও যে কী মিষ্টি, আপনাদের ধারণাই নেই! ঘুমোতে যাওয়ার আগে মিমির নির্দেশ, রোজ ক্যামোমিল টি খেতে হবে। কোথা থেকে জানি সেই চা আনিয়েছিল। নিজে হাতে চা বানাত। আমাকেও নিয়ম করে খাওয়াত। গরম জলে ক্যামোমিল দিলেই ফুটে উঠত ফুল। আমাদের বন্ধুত্বও যেন ওভাবেই পাপড়ি মেলেছিল। সকালের জলখাবার থেকে রাতের খাওয়া—এক মেন্যু আমাদের।” 

ব্যাংককের একটি ঘটনা উল্লেখ করে নুসরাত জাহান বলেন, “আমরা ব্যাংককে শুটিং করতে গিয়েছি। সারা দিন রোদের নিচে শুটিং। ত্বক পুড়ে ঝামা। কাজ ফুরোলে দুই বান্ধবী মিলে এত্ত টমেটো কিনে এনেছি! হোটেলে ফিরে সেগুলো চাকা চাকা করে কেটে একে অন্যের গায়ে টমেটো ঘষছি।”  

আড্ডায় মেতে থাকেন নুসরাত-মিমি। কিন্তু এ আড্ডায় কি গসিপিং থাকে? এ প্রশ্নের জবাবে নুসরাত জাহান বলেন, “গসিপিং এর মাত্রাই আলাদা। কারো নামে কিচ্ছু বলতাম না কিন্তু। আমরা তো নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। একদিন মিমির গহনার বাক্স থেকে দুল হারিয়ে গিয়েছে। ব্যস, ওর মুখ ভার। আমরা বেরিয়ে দোকানে গেলাম। দুল পছন্দ করে দিলাম। ও সেটা কিনল। সেটে এসে পরে শুটিং করল। তারপর ওর মুখে হাসি।” 

মিমি-নুসরাত যেমন ভালো সময় পার করেন, তেমনই ঝগড়াও করেন। এ বিষয়ে নুসরাত জাহান বলেন, “দুই বন্ধু মিলে কত বেড়াতে গিয়েছি! লাস ভেগাস কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেস। প্রচুর ভালো ভালো স্মৃতি। কত দুষ্টুমি করেছি। মিমি বরাবরের ‘ডেয়ার ডেভিল’। ‘বনগাঁকাণ্ড’ তো হালের। ওর চোখে কোনো কিছু অন্যায় মানেই তার প্রতিবাদ করবে। এখনকার মিমি তো অনেক পরিণত। আমি ‘বাচ্চা’ মিমিকেও দেখেছি। সেই ছেলেমানুষ মিমির রাগ হলেই ঝগড়া করে নেয়। আমাদের মধ্যে কম ঝগড়া হয়েছে? টিমের সামনে প্রচণ্ড ঝগড়া করেছি। রাতে ফাটাফাটি রাগ। পরের দিন সকালে মিমির ভালো ছবি কেউ তুলে দিতে পারছে না। আমি গিয়ে তুলে দিতেই ভাব।” 

খানিকটা ব্যাখ্যা করে নুসরাত জাহান বলেন, “আমি নিশ্চিত, আজও মিমি যখন প্যানকেক খায়, আমাকে মনে করে। এর পিছনেও তো স্মৃতি আছে। আমি আর ও রোজ রাতে চুপিচুপি বেরিয়ে প্যানকেক খেতাম। থাইল্যান্ডের সুনসান রাস্তা। ওখানকার ভাষায় প্যানকেকের নাম ‘ক্রেপস’। ফুটপাতে দু’জনে বসে পড়েছি। খাওয়া আর আড্ডা! ওখানে তো আমাদের কেউ চেনে না। এই পর্যন্ত পড়ে নিন্দুরো প্রশ্ন তুলবে, এতই যদি বন্ধুত্ব তা হলে মাঝে দূরত্ব তৈরি হল কেন? অনেকে এ রকমও বলেন, ‘দু’জন মেয়ে আজীবন ভালো বন্ধু থাকতেই পারে না!’ আমি বলি, পারে। অবশ্যই পারে। যদি সেই বন্ধুত্ব গভীর হয়। আমরা এখন নিজেদের মতো করে ব্যস্ত। আমার সন্তান আছে। তাকে সামলাতে গিয়ে দিনের বড় অংশ চলে যায়। মিমিও ওর মতো করে সংসারী। এখন কি আর আমরা আগের মতো ‘রইল ঝোলা চলল ভোলা’ বলে যা খুশি করতে পারি? আমরা তো বড় হয়েছি!” 

মাঝে মিমি-নুসরাতের বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, এ কথা যেমন অকপটে স্বীকার করেন, তেমনই তাদের বন্ধুত্ব কখনো নষ্ট হবে না বলে আত্মবিশ্বাসী নুসরাত। তার ভাষায়—“এই বিশ্বাস থেকেই বলছি, আমার আর মিমির বন্ধুত্ব কোনো দিন নষ্ট হওয়ার নয়। হ্যাঁ, মাঝে হয়তো দূরত্ব বেড়েছিল। অভিমানও কি ছায়া ফেলেছিল? কিন্তু বন্ধুত্বের ‘মৃত্যু’ ঘটেনি।” 

মিমিকে চিনতে হলে সময় দিতে হবে বলে জানান নুসরাত। এ অভিনেত্রী বলেন, “কাকতালীয়ভাবে আমরা দু’জনেই তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। ওর নাম আগে বেরিয়েছিল। ফোন করে জানিয়েছিল মিমি। একসঙ্গে পার্লামেন্টে গিয়েছি। কোনোরকমের দুষ্টুমি সেখানে করিনি। আসলে মিমির ভিতর আর বাহিরটা এক না। আমি যেভাবে ওকে চিনি, আপনারা চেনেন না। যেভাবে জানি, আপনারা জানেন না। সেই জায়গা থেকে বলতে পারি, মিমিকে জানতে হবে, বুঝতে হবে, সময় দিতে হবে; যা আজকের দিনে কেউ কাউকে দেয় না! তবেই মিমির সঠিক মূল্যায়ণ হবে।” 

মিমিকে আগলে রাখার দায়িত্ব নুসরাতের। তার ভাষায়—“আমি মিমির অনেক জন্মদিনের সাক্ষী। আমরা একসঙ্গে পার্টি করেছি। আর হইহুল্লোড় শেষে ঈশ্বরকে বলেছি, মিমি যেন একটুও না বদলায়। এক ইঞ্চি বদল চাই না ওর। যেমন আছে তেমনই থাকুক। সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। পরস্পরের অনেক ভালো-খারাপ সময়ের সাক্ষী আমরা। মিমিকে তাই আগলে রাখার দায়িত্ব আমার। টলিউড আমাদের ‘বোনুয়া’ নাম দিয়েছে। তুই নিশ্চিন্তে থাক। আজীবন তোর পাশে থাকবে তোর ‘বোনুয়া’।”